বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের যৌথ জরিপ এমআইসিএস-২০২৫ এর প্রাথমিক ফলাফলে বাংলাদেশে শিশুদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে চারজনের রক্তে ‘উদ্বেগজনক’ মাত্রার সীসা পাওয়া গেছে। এছাড়া, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ শতাংশ এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় আট শতাংশের দেহে সীসার মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
গতকাল রবিবার (১৬ নভেম্বর) রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে ইউনিসেফ ও অন্যান্য অংশীদারদের সহযোগিতায় পরিচালিত এই জরিপের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স উপস্থিত ছিলেন।
নতুন জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে হুমকি সৃষ্টিকারী সীসা দূষণ সব আর্থ-সামাজিক শ্রেণির ওপরই প্রভাব ফেলছে। আক্রান্ত শিশুদের অর্ধেকের বেশি ধনী এবং ৩০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে এসেছে।
জরিপে অপুষ্টি বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে কম ওজনের শিশুর হার যেখানে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল, তা বেড়ে ২০২৫ সালে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। মায়েদের অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা এখনও অত্যন্ত উচ্চ হারে (৫২ দশমিক আট শতাংশ) রয়েছে এবং কিশোরী জন্মহার (প্রতি এক হাজার মেয়ের মধ্যে) ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে। এসব ফলাফল মাতৃ ও শিশু পুষ্টি, সঠিক স্তন্যপান এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরছে।
শিশু সুরক্ষা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার এখন ৯ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়েছে। এর ফলে আরও ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিতে পড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ৮৬ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের সহিংস আচরণের শিকার হয়েছে।
তবে বাল্যবিয়ের হার ২০১৯ সালের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তবুও প্রায় অর্ধেক মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৫৯ শতাংশের নিবন্ধিত হয়েছে এবং ৪৭ শতাংশের এর জন্ম সনদ আছে, যা অনেক শিশুকে আইনগত পরিচয় এবং সেবা প্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, শিশু সুরক্ষায় প্রতি এক ডলার বিনিয়োগে নয়গুণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক লাভ পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য সূচকগুলো বিদ্যমান ঘাটতিগুলো নির্দেশ করে। নবজাতকের মৃত্যুহার এখনো প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে ২২, যা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ৭৫ শতাংশ প্রসবের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশনের হার বৃদ্ধি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক চাপ উভয়ই বাড়াচ্ছে। মাত্র ৪৬ শতাংশ নারী গর্ভধারণের প্রথম চার মাসের মধ্যে প্রসব-পূর্ব সেবা (অ্যান্টেনাল কেয়ার) নেন, যা মাতৃ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
স্যানিটেশন সেবায় প্রবেশাধিকার বেড়ে ৭৩ শতাংশে পৌঁছালেও, নিরাপদভাবে পরিচালিত পানীয় জলের হার ৩৯ দশমিক তিন শতাংশে নেমে এসেছে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশের ১০ কোটিরও বেশি মানুষ নিরাপদভাবে পরিচালিত পানীয় পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পানীয় জলের প্রায় অর্ধেক উৎস এবং গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত পানির ৮০ শতাংশের বেশি নমুনা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে দূষিত।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির উচ্চ হার (৮০ শতাংশ) বজায় থাকলেও, উচ্চতর স্তরে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার তীব্রভাবে কমেছে। অনেক শিশু মৌলিক দক্ষতা অর্জন ছাড়াই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করছে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী বয়সী শিশুদের প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ স্কুলের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, বাল্যবিয়ে ও শিশু মৃত্যুহার কম প্রমাণ করে যে অগ্রগতি সম্ভব, কিন্তু সীসা–দূষণ এবং শিশুশ্রমের মতো সংকট লাখ লাখ শিশুকে তাদের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত করছে। ইউনিসেফ এই তথ্যকে সুনির্দিষ্ট কাজে পরিণত করতে এবং কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে সেই লক্ষ্যে পরিবর্তন আনতে সরকারকে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এমআইসিএস-২০২৫ জরিপটি প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে এবং এটি জাতীয় অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ১৭২টি মানদণ্ড এবং ২৭টি এসডিজি সূচককে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
রিপোর্টারের নাম 

























