ঢাকা ০২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহে অব্যবস্থাপনা: দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে ২৫০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু

ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট প্রাদুর্ভাবের মধ্যে, ৫ এপ্রিল ডিএনসিসি-র সাবেক কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে হাম থেকে শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় আক্রান্ত একটি শিশুকে পরিবারের এক সদস্য অক্সিজেন দিচ্ছেন।

দেশে হামের এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৫০ জনেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। স্বনামধন্য বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই মর্মান্তিক তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় নীতিগত পরিবর্তনের কারণে দেশব্যাপী টিকার যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল, মূলত সেটাই আজকের এই মহামারির আকার ধারণ করেছে।

হাসপাতালগুলোর মর্মান্তিক চিত্র

হামের কারণে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এখন এক বিশৃঙ্খল ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালে কনিকা আক্তার নামের এক মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। ওইদিনই তার ছয় মাস বয়সী যমজ কন্যা রিসা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে তার আরেক কন্যা রুহি একই আইসিইউ বেডে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।

যেখান থেকে বিপর্যয়ের শুরু

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু টিকাদানে ঈর্ষণীয় সাফল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়ে আসছিল। ইউনিসেফ এবং ‘গাভি’ (Gavi)-এর সহায়তায় নিয়মিত হাম-রুবেলার (MR) টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইউনিসেফ সে সময় এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল যে, এর ফলে টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস জানান, তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন।

নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টিকার সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশজুড়ে রুটিন টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

পুষ্টিহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এবং খুব দ্রুত তা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়ে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানান, ২০২৪ সাল থেকে দেশে ভিটামিন-এ বিতরণের তিনটি ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। শিশুদের অপুষ্টি এবং ভিটামিন-এ এর ঘাটতি হামের এই মৃত্যুহারকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

জবাবদিহিতা ও আইনি পদক্ষেপ

এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও ক্ষোভ বাড়ছে। গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান ‘সায়েন্স’কে দেওয়া এক ইমেইল বার্তায় দাবি করেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তারা জরুরি আইনের পরিবর্তে প্রচলিত নিয়মে টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় কোথায় ভুল হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি।

বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে এরই মধ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, এপ্রিলে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে।

গত ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হাম যে দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে, তাতে এই মহামারি তাৎক্ষণিকভাবে থামানো বেশ কঠিন হবে। আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার জন্য দ্রুত ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মাধবপুরে সাড়ে ১০ লাখ টাকার ৭০ কেজি গাঁজা উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার

অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহে অব্যবস্থাপনা: দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে ২৫০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু

আপডেট সময় : ০৯:৫৯:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

দেশে হামের এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৫০ জনেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। স্বনামধন্য বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই মর্মান্তিক তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় নীতিগত পরিবর্তনের কারণে দেশব্যাপী টিকার যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল, মূলত সেটাই আজকের এই মহামারির আকার ধারণ করেছে।

হাসপাতালগুলোর মর্মান্তিক চিত্র

হামের কারণে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এখন এক বিশৃঙ্খল ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালে কনিকা আক্তার নামের এক মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। ওইদিনই তার ছয় মাস বয়সী যমজ কন্যা রিসা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে তার আরেক কন্যা রুহি একই আইসিইউ বেডে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।

যেখান থেকে বিপর্যয়ের শুরু

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু টিকাদানে ঈর্ষণীয় সাফল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়ে আসছিল। ইউনিসেফ এবং ‘গাভি’ (Gavi)-এর সহায়তায় নিয়মিত হাম-রুবেলার (MR) টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইউনিসেফ সে সময় এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল যে, এর ফলে টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস জানান, তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন।

নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টিকার সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশজুড়ে রুটিন টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

পুষ্টিহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এবং খুব দ্রুত তা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়ে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানান, ২০২৪ সাল থেকে দেশে ভিটামিন-এ বিতরণের তিনটি ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। শিশুদের অপুষ্টি এবং ভিটামিন-এ এর ঘাটতি হামের এই মৃত্যুহারকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

জবাবদিহিতা ও আইনি পদক্ষেপ

এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও ক্ষোভ বাড়ছে। গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান ‘সায়েন্স’কে দেওয়া এক ইমেইল বার্তায় দাবি করেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তারা জরুরি আইনের পরিবর্তে প্রচলিত নিয়মে টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় কোথায় ভুল হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি।

বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে এরই মধ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, এপ্রিলে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে।

গত ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হাম যে দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে, তাতে এই মহামারি তাৎক্ষণিকভাবে থামানো বেশ কঠিন হবে। আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার জন্য দ্রুত ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন।