দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৭২৬ টাকা স্পর্শ করেছে। বুধবার (৮ অক্টোবর) থেকে এই ভালো মানের স্বর্ণের ভরি বিক্রি হবে ২ লাখ ২ হাজার ১৯৫ টাকায়—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড মূল্য।
মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাজুস ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম এক হাজার ৩৬৯ টাকা বাড়িয়েছে। বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পাকা স্বর্ণ) মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে খুচরা বাজারে এই সমন্বয় আনা হয়েছে।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের হিসাবে, স্বর্ণের ভরি ২ লাখ টাকা ছাড়ালেও, ৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করার ফলে ক্রেতাকে এক ভরি গয়না কিনতে খরচ করতে হচ্ছে প্রায় সোয়া ২ লাখ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই আকাশছোঁয়া দামে ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছেন, ফলে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়ছেন।
তিন বছরে ৮৩ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা: দামের অবিশ্বাস্য উত্থান
বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২ সালের ২২ আগস্ট প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল ৮৩ হাজার ২৮০ টাকা। এর ঠিক তিন বছর পর, মূল্যবৃদ্ধি বর্তমানে ২ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দামের প্রভাব দেখলে বোঝা যায় এই পরিবর্তন কতটা দ্রুত ঘটেছে: ২০০০ সালে ২২ ক্যারেট এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ৬,৯০০ টাকা। ২০১০ সালে তা হয় ৪২,১৬৫ টাকা, ২০২০ সালে ৭০,০০০ টাকা এবং ২০২৩ সালে তা প্রথমবারের মতো এক লাখ টাকা অতিক্রম করে। চলতি বছরের শুরুতে দাম দেড় লাখ থাকলেও, এখন তা ২ লাখ টাকারও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ায়, দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
বাজুসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিশ্ব বাজারের ওপর নির্ভর করে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “সোনার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বিক্রি কমায় কারিগররা বেকার হয়ে পড়ছেন।”
মধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার বাইরে স্বর্ণ: বিলাসপণ্যে রূপান্তর
বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য স্বর্ণ কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এক সময় বিয়ে, উৎসব বা সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণ কেনা হলেও, এখন তা বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে।
ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার এক জুয়েলার্স মালিকের কথায়, “আগে গ্রাহকরা নিয়মিত গয়না বানাতে দোকানে আসতেন। এখন অনেকে শুধু দেখতে আসেন। ক্রেতা কমে গেছে, কিন্তু দাম বাড়ছেই।” পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের পাঁচ দশকের স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোবিন্দ হালদার বলেন, “স্বাধীনতার আগেও গিনি স্বর্ণের দাম যখন ভরি দেড়শত টাকা ছিল, তখনও মানুষের অভিযোগ ছিল দাম নাগালের বাইরে। এখন তো অবস্থা আরও কঠিন।’’ ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের গুলশান শাখার ইনচার্জ সাগর সরকার জানান, দাম বাড়লে সাধারণত বিক্রি বাড়ে, কিন্তু এবার উল্টোটা হচ্ছে; অনেক ক্রেতারই এখন স্বর্ণ কেনার সামর্থ্য নেই।
এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারেও স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়ছে। সোমবার (৬ অক্টোবর) রাতে বুলিয়নভল্ট ডটকম এবং গোল্ডপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এক আউন্স স্বর্ণ ৩,৯৪৮ থেকে ৩,৯৬৬ ডলার দামে কেনাবেচা হয়েছে, যা এক মাস আগের তুলনায় প্রায় ৮.৬১ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে এই ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে মনে করা হচ্ছে।
দাম বৃদ্ধির নেপথ্যের কারণ: আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ
বাজার বিশ্লেষক ও স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মতে, রেকর্ড পরিমাণ দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ দায়ী:
ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন: দেশে ডলারের সংকট এবং টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে, ফলে স্থানীয় বাজারে স্বর্ণ আমদানির খরচও বেড়েছে।
আমদানি সীমাবদ্ধতা ও চোরাচালান: বৈধ আমদানিতে জটিলতা থাকায় বাজারে স্বর্ণের সরবরাহ কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা বেশি হলেও সরবরাহ কম থাকায় দাম বাড়ছে।
উৎসব ও বিয়ের মৌসুমের চাহিদা: প্রতি বছর অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়টিতে দেশে বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুত বৃদ্ধি: ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, বৈশ্বিক সরকারি স্বর্ণ মজুত ৩৬,৭০০ টন ছাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এক বছরে ১,১৮০ টন স্বর্ণ কিনেছে, যা ১৯৬৭ সালের পর সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডলারের স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণকে বেছে নিচ্ছেন।
মাসুদুর রহমান জানান, “পুঁজিবাজারে লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকি জেনেও বিনিয়োগ করছে। অথচ স্বর্ণে বিনিয়োগে লোকসান হয়েছে—এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া বিরল। সাজসজ্জার বাইরে স্বর্ণকে যদি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়, তবে দাম যতই বাড়ুক চাহিদা কমবে না।”
রুপার স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের বার্তা
যেখানে স্বর্ণের দাম আকাশচুম্বী, সেখানে রুপার বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তিন বছরে রুপার দাম প্রায় দ্বিগুণ বাড়লেও (২০২৫ সালে ২২ ক্যারেট রুপার দাম ৩,৬২৮ টাকা), তা এখনও সাধারণ মানুষের নাগালে।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত, তখন স্বর্ণ আবারও হয়ে উঠছে নিরাপদ আশ্রয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো শুধু দামের কারণে স্বর্ণ কিনছে না, বরং বিকল্প সম্পদগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, “স্বর্ণ এখন শুধু অলংকার নয়, এটি বিনিয়োগ সম্পদেও পরিণত হয়েছে। বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লেই স্বর্ণের দিকে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বাড়বে, এটা বৈশ্বিক প্রবণতা।”
সবমিলিয়ে, বিশ্ববাজারের প্রভাব, ডলারের সংকট, স্থানীয় চাহিদা এবং বিনিয়োগের প্রবণতা—সবকিছু মিলে স্বর্ণ এখন নিরাপদ বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার প্রতীক। তবে এর সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে: স্বর্ণ কি এখন কেবল ধনীদের হাতের সম্পদ হয়ে উঠবে?
রিপোর্টারের নাম 

























