পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের চামড়া খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে প্রতি বছরই বিশেষ ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণে আগ্রহ দেখায় না অধিকাংশ ব্যাংক। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, খেলাপি ঋণের অজুহাত দেখিয়ে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে অনীহা প্রকাশ করছে, যার ফলে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে প্রতিবছরই সংকট তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যদিও গত বছর এই লক্ষ্য ছিল ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু নির্ধারিত লক্ষ্যের বিপরীতে ঋণ বিতরণ হয়েছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে ৬১০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ করা হয় ১২৫ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে ৪৪৩ কোটি টাকার মধ্যে ঋণ দেওয়া হয়েছিল ২৭০ কোটি টাকা।
চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিশাল ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো নিয়মিতভাবে খেলাপি ঋণের বিষয়টি সামনে এনে নতুন অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। অথচ এই খাতে খেলাপি ঋণের হার সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের তুলনায় খুব বেশি নয় বলে দাবি তাদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে চামড়া শিল্প খাতে মোট ঋণের স্থিতি প্রায় ১৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। যদিও এই হার নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, পুরো খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখিয়ে অর্থায়ন সীমিত করার ফলে শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চামড়া শিল্প মালিকদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ বিতরণের নির্দেশনা দিলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকি করে না। অন্যদিকে বিভিন্ন খাতের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা দেওয়া হলেও চামড়া শিল্প সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অনেক ট্যানারি মালিক পুনঃতফসিলকৃত ঋণ নবায়নের শর্ত পূরণে আগ্রহ দেখান না। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণেও চামড়া খাতে ঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয় না।
তবে ঈদ মৌসুমে চামড়া কেনাবেচা সহজ করতে কিছু শর্ত শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ৫ মে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ রয়েছে এমন ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট কিস্তি পরিশোধ বা সমঝোতা অর্থ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত শিথিল থাকবে। ফলে পুরোনো ঋণ থাকলেও কোরবানির চামড়া সংগ্রহের জন্য তারা নতুন কার্যকরী মূলধন ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
চামড়ার আড়তদার বাবুল হোসেন বলেন, দেশের অধিকাংশ কাঁচা চামড়া ঈদুল আজহার সময় সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থায়ন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর প্রায় ৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। তিনি জানান, জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ খাত থেকে গত অর্থবছরে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। তাই শিল্পটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ট্যানারি মালিক ও বাণিজ্যিক রপ্তানিকারক মিলিয়ে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭০০। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য ছোট আড়ত ও মৌসুমি ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা কোরবানির সময় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবসায়ী আজম মিয়া অভিযোগ করেন, ব্যাংকগুলো মূলত বড় ট্যানারি মালিক ও রপ্তানিকারকদের ঋণ সুবিধা দেয়। কিন্তু কাঁচা চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত অনেক আড়তদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পান না। ফলে চাহিদা অনুযায়ী অর্থের সংকট তৈরি হয় এবং চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, চলতি বছরে চামড়া খাতে ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কত টাকা ঋণ ছাড় হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যবসায়ী ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধে অনীহা দেখান, যার ফলে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে চামড়া খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে সময়মতো পর্যাপ্ত অর্থায়ন, কার্যকর তদারকি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনে একই ধরনের সংকট পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 























