ঢাকা ০৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দাম্পত্য কলহে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যে যে প্রভাব পড়ে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৫৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪২ বার পড়া হয়েছে

দাম্পত্য জীবন দুটি মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তবে সব সম্পর্কেই মতবিরোধ হয়, যা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই মতবিরোধ নিয়মিত তীব্র কলহে রূপ নেয়, তখন তা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর গভীর প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর, বিশেষ করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশে।
 
শিশুরা তাদের চারপাশের পরিবেশ থেকেই শেখে। পরিবার তাদের প্রথম শিক্ষালয়। মা-বাবার আচরণ, সম্পর্কের ধরন ও পারস্পরিক যোগাযোগ শিশুদের মানসিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন তারা দেখে বাবা-মার মধ্যে চিৎকার, ঝগড়া, অপমান বা সহিংসতা হচ্ছে, তখন তা তাদের মনে ভয়, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

দাম্পত্য কলহের প্রভাবসমূহ—

আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার হ্রাস

দাম্পত্য কলহে বেড়ে ওঠা শিশুরা অনেক সময় নিজেদের দোষী ভাবতে শুরু করে। তারা মনে করে বাবা-মার ঝগড়ার কারণ তারাই। এই অপরাধবোধ তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।

আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা

বিজ্ঞাপন
অনেক সময় সন্তানরা বুঝে উঠতে পারে না কীভাবে তাদের আবেগ প্রকাশ করবে। তারা রাগ, কষ্ট বা ভয়কে দমন করতে শেখে, যার ফলে পরবর্তীতে তারা মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতায় ভুগতে পারে।

মানসিক ডিপ্রেশন থেকে অপরাধ-প্রবণতা

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক কলহের মধ্য দিয়ে যে ছেলে সন্তান বড় হয়, বড় হওয়ার পর তার মাদকাসক্তি, অবাধ্যতা, মারামারি করার প্রবণতা বেশি রাখা যায়। অপরদিকে কন্যা শিশুরা চাপা স্বভাবের হওয়ার কারণে ভেতরে তারা চাপ অনুভব করে এবং অস্থিরতা দেখা যায়। পরে তাদের মধ্যে সংসারের ভয়, ডিপ্রেশনসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।

শিক্ষায় মনোযোগের ঘাটতি

নির্বিচারে চলতে থাকা পারিবারিক ঝগড়া শিশুর একাগ্রতা নষ্ট করে। ফলে তাদের পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যায়, ফলাফলও খারাপ হয়।

ব্যাঘাত ঘটে সন্তানের ঘুমে
বাবা-মায়ের ঝগড়ার কারণে সন্তানদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বাচ্চাদের মস্তিষ্কের প্রাথমিক বিকাশ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে। শুধু তাই নয়, স্কুলে তার আচার-আচরণে সমস্যা হতে পারে। শিশু বিষণ্নতায় ভুগতে পারে এবং পড়াশোনায় অমনোযোগিতা দেখা যেতে পারে। অনেক সময় ছেলেমেয়ে যদি একটু বড় হয় তাহলে তাদের মধ্যে নিজের ক্ষতি নিজে করা প্রবণতা দেখা যায়।

সম্পর্কে অবিশ্বাস ও ভয়

বাবা-মার মধ্যে ভালোবাসার অভাব দেখে বেড়ে ওঠা শিশুরা পরবর্তী জীবনে সম্পর্ক নিয়ে ভয় বা অবিশ্বাসে ভোগে। এমনকি তারা ভবিষ্যতে নিজের সম্পর্কেও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

মানসিক শক্তি কমে যেতে থাকে
বাচ্চারা বাবা-মার সম্পর্কে শীতলতা সহজেই ধরতে পারে। পরিবারে যে বাবা-মার দ্বন্দ্ব রয়েছে শিশুরা বুঝতে পারে। একটি শিশু ছয় মাস বয়স থেকেই পারিবারিক অশান্তি অনুভব করতে পারে। যদিও সে প্রকাশ করতে পারে না। পরিস্থিতি এমন হলে তার মানসিক ভিত্তিও যে খুব দৃঢ় হবে এমন নয়।

দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যা

যেসব শিশু দীর্ঘ সময় ধরে দাম্পত্য কলহের মধ্যে বড় হয়, তাদের মধ্যে Post-Traumatic Stress Disorder (PTSD), Generalized Anxiety Disorder (GAD), এমনকি Clinical Depression-এর লক্ষণও দেখা যেতে পারে। কেউ কেউ আবার আত্মবিনাশী হয়ে উঠতে পারে, যা মাদকাসক্তি বা আত্মহত্যার চিন্তার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

 প্রতিকারের পথ

মা-বাবার উচিত সন্তানের সামনে ঝগড়া না করা। একে অপরের সঙ্গে সম্মানজনক ও শান্ত ভাষায় কথা বলা শিশুকে নিরাপত্তা ও স্থিতি শেখায়।
সন্তানের অনুভূতিগুলো গুরুত্ব দিয়ে শোনা ও তাকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। এতে শিশুর মনে হবে সে গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ।
প্রয়োজনে পারিবারিক কাউন্সেলিং বা শিশুর জন্য সাইকোলজিক্যাল থেরাপি নেওয়া যেতে পারে। এটি সন্তানের মানসিক জটিলতা দূর করতে সাহায্য করে।
 

দাম্পত্য কলহ শুধু একটি সম্পর্কের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তার ঢেউ সন্তানের মানসিক জগতে গভীরভাবে আঘাত হানে। তাই সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে, প্রথমেই দরকার একটি সহানুভূতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও ভালোবাসায় পূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা। বাবা-মা যদি নিজেদের সম্পর্ককে সচেতনভাবে মেরামত করতে চান, তাহলে তার সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হবে তাদের সন্তান।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সমীকরণ: চীন থেকে অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিসাইল কিনছে ইরান

দাম্পত্য কলহে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যে যে প্রভাব পড়ে

আপডেট সময় : ০২:৫৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

দাম্পত্য জীবন দুটি মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তবে সব সম্পর্কেই মতবিরোধ হয়, যা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই মতবিরোধ নিয়মিত তীব্র কলহে রূপ নেয়, তখন তা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর গভীর প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর, বিশেষ করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশে।
 
শিশুরা তাদের চারপাশের পরিবেশ থেকেই শেখে। পরিবার তাদের প্রথম শিক্ষালয়। মা-বাবার আচরণ, সম্পর্কের ধরন ও পারস্পরিক যোগাযোগ শিশুদের মানসিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন তারা দেখে বাবা-মার মধ্যে চিৎকার, ঝগড়া, অপমান বা সহিংসতা হচ্ছে, তখন তা তাদের মনে ভয়, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

দাম্পত্য কলহের প্রভাবসমূহ—

আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার হ্রাস

দাম্পত্য কলহে বেড়ে ওঠা শিশুরা অনেক সময় নিজেদের দোষী ভাবতে শুরু করে। তারা মনে করে বাবা-মার ঝগড়ার কারণ তারাই। এই অপরাধবোধ তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।

আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা

বিজ্ঞাপন
অনেক সময় সন্তানরা বুঝে উঠতে পারে না কীভাবে তাদের আবেগ প্রকাশ করবে। তারা রাগ, কষ্ট বা ভয়কে দমন করতে শেখে, যার ফলে পরবর্তীতে তারা মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতায় ভুগতে পারে।

মানসিক ডিপ্রেশন থেকে অপরাধ-প্রবণতা

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক কলহের মধ্য দিয়ে যে ছেলে সন্তান বড় হয়, বড় হওয়ার পর তার মাদকাসক্তি, অবাধ্যতা, মারামারি করার প্রবণতা বেশি রাখা যায়। অপরদিকে কন্যা শিশুরা চাপা স্বভাবের হওয়ার কারণে ভেতরে তারা চাপ অনুভব করে এবং অস্থিরতা দেখা যায়। পরে তাদের মধ্যে সংসারের ভয়, ডিপ্রেশনসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।

শিক্ষায় মনোযোগের ঘাটতি

নির্বিচারে চলতে থাকা পারিবারিক ঝগড়া শিশুর একাগ্রতা নষ্ট করে। ফলে তাদের পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যায়, ফলাফলও খারাপ হয়।

ব্যাঘাত ঘটে সন্তানের ঘুমে
বাবা-মায়ের ঝগড়ার কারণে সন্তানদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বাচ্চাদের মস্তিষ্কের প্রাথমিক বিকাশ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে। শুধু তাই নয়, স্কুলে তার আচার-আচরণে সমস্যা হতে পারে। শিশু বিষণ্নতায় ভুগতে পারে এবং পড়াশোনায় অমনোযোগিতা দেখা যেতে পারে। অনেক সময় ছেলেমেয়ে যদি একটু বড় হয় তাহলে তাদের মধ্যে নিজের ক্ষতি নিজে করা প্রবণতা দেখা যায়।

সম্পর্কে অবিশ্বাস ও ভয়

বাবা-মার মধ্যে ভালোবাসার অভাব দেখে বেড়ে ওঠা শিশুরা পরবর্তী জীবনে সম্পর্ক নিয়ে ভয় বা অবিশ্বাসে ভোগে। এমনকি তারা ভবিষ্যতে নিজের সম্পর্কেও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

মানসিক শক্তি কমে যেতে থাকে
বাচ্চারা বাবা-মার সম্পর্কে শীতলতা সহজেই ধরতে পারে। পরিবারে যে বাবা-মার দ্বন্দ্ব রয়েছে শিশুরা বুঝতে পারে। একটি শিশু ছয় মাস বয়স থেকেই পারিবারিক অশান্তি অনুভব করতে পারে। যদিও সে প্রকাশ করতে পারে না। পরিস্থিতি এমন হলে তার মানসিক ভিত্তিও যে খুব দৃঢ় হবে এমন নয়।

দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যা

যেসব শিশু দীর্ঘ সময় ধরে দাম্পত্য কলহের মধ্যে বড় হয়, তাদের মধ্যে Post-Traumatic Stress Disorder (PTSD), Generalized Anxiety Disorder (GAD), এমনকি Clinical Depression-এর লক্ষণও দেখা যেতে পারে। কেউ কেউ আবার আত্মবিনাশী হয়ে উঠতে পারে, যা মাদকাসক্তি বা আত্মহত্যার চিন্তার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

 প্রতিকারের পথ

মা-বাবার উচিত সন্তানের সামনে ঝগড়া না করা। একে অপরের সঙ্গে সম্মানজনক ও শান্ত ভাষায় কথা বলা শিশুকে নিরাপত্তা ও স্থিতি শেখায়।
সন্তানের অনুভূতিগুলো গুরুত্ব দিয়ে শোনা ও তাকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। এতে শিশুর মনে হবে সে গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ।
প্রয়োজনে পারিবারিক কাউন্সেলিং বা শিশুর জন্য সাইকোলজিক্যাল থেরাপি নেওয়া যেতে পারে। এটি সন্তানের মানসিক জটিলতা দূর করতে সাহায্য করে।
 

দাম্পত্য কলহ শুধু একটি সম্পর্কের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তার ঢেউ সন্তানের মানসিক জগতে গভীরভাবে আঘাত হানে। তাই সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে, প্রথমেই দরকার একটি সহানুভূতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও ভালোবাসায় পূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা। বাবা-মা যদি নিজেদের সম্পর্ককে সচেতনভাবে মেরামত করতে চান, তাহলে তার সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হবে তাদের সন্তান।