ঢাকা ১১:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

জুলাই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্ট সংশোধনের দাবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের প্রকাশিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে উল্লেখ করা নিহতের সংখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি তুলে প্রতিবেদনটি সংশোধন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্কের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী স্টিভেন পাউলস কেসি। গত ২৮ মে পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লিখিত নিহতের সংখ্যা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে এক হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের গেজেট ২০২৪’-এ নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ জন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পৃথক তালিকায় প্রায় ৬৫০ জন নিহতের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্যের সঙ্গে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানের বড় ধরনের অমিল রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি গেজেট ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রকাশিত তালিকার তুলনায় জাতিসংঘের দেওয়া সংখ্যা অনেক বেশি এবং তা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তিনি এই সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে উল্লেখ করে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান।

চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে পরিচালিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এছাড়া তদন্তের সময়সীমা ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখায় পরবর্তী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাব্য ঘটনাগুলো প্রতিবেদনে স্থান পায়নি বলেও দাবি করা হয়।

স্টিভেন পাউলসের মতে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে এই পার্থক্য রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তার অভিযোগ, এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার অভিযোগকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

চিঠির শেষাংশে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, যদি তথ্যগত অসঙ্গতি থেকে থাকে তাহলে এক হাজার ৪০০ জন নিহতের তথ্যটি সংশোধন ও জনসমক্ষে প্রত্যাহার করা উচিত। পাশাপাশি ভবিষ্যতের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

এদিকে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে সাংবাদিক আনিস আলমগীরের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের মাধ্যমে। তিনি চিঠিটির ছবি প্রকাশ করে উল্লেখ করেন, জুলাই আন্দোলনে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। জাতিসংঘের রিপোর্ট ও সরকারি গেজেটের তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকায় বিষয়টি আবারও জনপরিসর ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটির সঠিক পরিসংখ্যান নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই এখন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য ও সরকারি নথির মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

খেলাপি ঋণের অজুহাতে চামড়া খাতে নতুন অর্থায়নে অনাগ্রহ ব্যাংকগুলোর

জুলাই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্ট সংশোধনের দাবি

আপডেট সময় : ১০:৩৫:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের প্রকাশিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে উল্লেখ করা নিহতের সংখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি তুলে প্রতিবেদনটি সংশোধন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্কের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী স্টিভেন পাউলস কেসি। গত ২৮ মে পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লিখিত নিহতের সংখ্যা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে এক হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের গেজেট ২০২৪’-এ নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ জন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পৃথক তালিকায় প্রায় ৬৫০ জন নিহতের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্যের সঙ্গে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানের বড় ধরনের অমিল রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি গেজেট ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রকাশিত তালিকার তুলনায় জাতিসংঘের দেওয়া সংখ্যা অনেক বেশি এবং তা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তিনি এই সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে উল্লেখ করে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান।

চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে পরিচালিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এছাড়া তদন্তের সময়সীমা ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখায় পরবর্তী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাব্য ঘটনাগুলো প্রতিবেদনে স্থান পায়নি বলেও দাবি করা হয়।

স্টিভেন পাউলসের মতে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে এই পার্থক্য রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তার অভিযোগ, এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার অভিযোগকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

চিঠির শেষাংশে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, যদি তথ্যগত অসঙ্গতি থেকে থাকে তাহলে এক হাজার ৪০০ জন নিহতের তথ্যটি সংশোধন ও জনসমক্ষে প্রত্যাহার করা উচিত। পাশাপাশি ভবিষ্যতের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

এদিকে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে সাংবাদিক আনিস আলমগীরের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের মাধ্যমে। তিনি চিঠিটির ছবি প্রকাশ করে উল্লেখ করেন, জুলাই আন্দোলনে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। জাতিসংঘের রিপোর্ট ও সরকারি গেজেটের তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকায় বিষয়টি আবারও জনপরিসর ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটির সঠিক পরিসংখ্যান নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই এখন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য ও সরকারি নথির মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা হতে পারে।