ঢাকা ১২:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে বিপন্ন কুয়াকাটা: পর্যটন ব্যবসায় ধস

দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় বর্তমানে এক ভয়াবহ পর্যটক খরা দেখা দিয়েছে, যার মূলে রয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট ও প্রশাসনের কড়া বিধিনিষেধ। সাধারণত সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে কুয়াকাটা সৈকত পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে লেম্বুরবন, গঙ্গামতি ও রাখাইন মার্কেট—সবখানেই ছিল একপ্রকার নীরবতা। জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির যাতায়াত কমে যাওয়া এবং সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের বাধ্যবাধকতা পর্যটন নগরীটিকে দ্রুত অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে। ফলে পর্যটকরা তাদের অবস্থান সংক্ষিপ্ত করছেন এবং রাতের কুয়াকাটা তার চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ছে।

পর্যটন খাতের এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা। সৈকতের ফটোগ্রাফার থেকে শুরু করে আচার বিক্রেতা ও মোটরসাইকেল চালকরা এখন চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। পর্যটকের দেখা না মেলায় সারা দিন অপেক্ষা করেও অনেকের নূন্যতম আয় হচ্ছে না, যা তাদের জীবনযাত্রাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, আগে এক দিনে যে পরিমাণ পণ্য বিক্রি হতো, এখন পুরো সপ্তাহেও সেই লক্ষমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। আয়ের বদলে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখন তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার কথা ভাবছেন।

বড় বিনিয়োগকারী ও হোটেল-মোটেল মালিকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোর বুকিং আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১৫-২০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগে ছুটির দিনে ৮০ শতাংশের উপরে থাকতো। ব্যক্তিগত গাড়িতে আসা পর্যটকের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে হোটেলের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, স্টাফদের বেতন এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে মালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এই খাতে নতুন বিনিয়োগ যেমন মুখ থুবড়ে পড়বে, তেমনি অনেক বড় প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

সব মিলিয়ে কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষের জীবিকা এখন গভীর সংকটে। হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বুকিং সংকটের কারণে অনেক কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন অথবা বেতন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধের এই দ্বিমুখী চাপে কুয়াকাটার পর্যটন খাতে যে স্থবিরতা নেমে এসেছে, তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, দ্রুত পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করা এবং রাতের কুয়াকাটাকে গতিশীল করার ব্যবস্থা না করলে কুয়াকাটার আকর্ষণ ও ভবিষ্যৎ উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিলে সংসদের সিলমোহর: রাজপথে নয়, লড়াই এবার উচ্চ আদালতে?

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে বিপন্ন কুয়াকাটা: পর্যটন ব্যবসায় ধস

আপডেট সময় : ১০:৩৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় বর্তমানে এক ভয়াবহ পর্যটক খরা দেখা দিয়েছে, যার মূলে রয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট ও প্রশাসনের কড়া বিধিনিষেধ। সাধারণত সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে কুয়াকাটা সৈকত পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে লেম্বুরবন, গঙ্গামতি ও রাখাইন মার্কেট—সবখানেই ছিল একপ্রকার নীরবতা। জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির যাতায়াত কমে যাওয়া এবং সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের বাধ্যবাধকতা পর্যটন নগরীটিকে দ্রুত অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে। ফলে পর্যটকরা তাদের অবস্থান সংক্ষিপ্ত করছেন এবং রাতের কুয়াকাটা তার চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ছে।

পর্যটন খাতের এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা। সৈকতের ফটোগ্রাফার থেকে শুরু করে আচার বিক্রেতা ও মোটরসাইকেল চালকরা এখন চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। পর্যটকের দেখা না মেলায় সারা দিন অপেক্ষা করেও অনেকের নূন্যতম আয় হচ্ছে না, যা তাদের জীবনযাত্রাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, আগে এক দিনে যে পরিমাণ পণ্য বিক্রি হতো, এখন পুরো সপ্তাহেও সেই লক্ষমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। আয়ের বদলে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখন তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার কথা ভাবছেন।

বড় বিনিয়োগকারী ও হোটেল-মোটেল মালিকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোর বুকিং আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১৫-২০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগে ছুটির দিনে ৮০ শতাংশের উপরে থাকতো। ব্যক্তিগত গাড়িতে আসা পর্যটকের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে হোটেলের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, স্টাফদের বেতন এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে মালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এই খাতে নতুন বিনিয়োগ যেমন মুখ থুবড়ে পড়বে, তেমনি অনেক বড় প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

সব মিলিয়ে কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষের জীবিকা এখন গভীর সংকটে। হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বুকিং সংকটের কারণে অনেক কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন অথবা বেতন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধের এই দ্বিমুখী চাপে কুয়াকাটার পর্যটন খাতে যে স্থবিরতা নেমে এসেছে, তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, দ্রুত পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করা এবং রাতের কুয়াকাটাকে গতিশীল করার ব্যবস্থা না করলে কুয়াকাটার আকর্ষণ ও ভবিষ্যৎ উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে।