ঢাকা ১০:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার উজ্জ্বল অগ্রগতি: পাসের হার–ভর্তি প্রবণতা সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:২৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ বোর্ডে গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অনুত্তীর্ণ হয়েছেন ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ শিক্ষার্থী। তবে এমন ফলাফল-বিপর্যয়ের মধ্যেও বোর্ডওয়ারি পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে যেখানে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ, সেখানে আলিম পরীক্ষায় পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। কারিগরি বোর্ডেও পাসের হার ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা বোর্ডের ফল নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে দাখিল স্তরে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও কম ভর্তি হতো আলিম স্তরে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসায় এই চিত্র পাল্টে গেছে। আগামী ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে আলিম স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তি বেড়েছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছে বোর্ড। মাদ্রাসা শিক্ষার এই অগ্রগতি সামনে রেখে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে দাখিলে চালু হচ্ছে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা, যার কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক তৈরির কাজ চলছে।

বোর্ড কর্তৃপক্ষের মতে, গণঅভ্যুত্থানের আগে মাদ্রাসা শিক্ষাকে ঘিরে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চলত। ইবতেদায়ি ও দাখিলে ভর্তি স্থিতিশীল থাকলেও আলিম স্তরে শিক্ষার্থী সাধারণত কলেজে চলে যেতেন। মাদ্রাসা সনদ নিয়ে উচ্চশিক্ষায় সুযোগ কম–এমন ধারণায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা দ্বিধায় ভুগতেন। অথচ আন্দোলনের পর ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হওয়ায় ভর্তি বেড়েছে। অন্যদিকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা করেন, যা ভালো ফলাফলের অন্যতম কারণ বলে মনে করছে বোর্ড।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ১৩২ জন, পাস করেছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন। কিন্তু দুই বছর পর আলিম পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ৮৫ হাজার ৫৫৮ জন। ২০২৩ সালেও দাখিল থেকে আলিমে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় দুই লাখ। তবে গত বছরের দাখিলে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০২৬ সালের আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী। এটি আগের দুই বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

মাদ্রাসাকে নিয়ে প্রচলিত ধারণায় বলা হতো—এখানে পড়াশোনা সহজ, খাতা মূল্যায়ন উদার, কিংবা পরীক্ষাকেন্দ্র বেশি। কিন্তু বাস্তবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১৩০০ নম্বরের পাশাপাশি কোরআন, হাদিস, আরবি ও ফিকাহসহ মোট ১৭০০ নম্বরে পরীক্ষা দেয়। পাশাপাশি সাধারণ বোর্ডের মতোই সব মৌলিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ভাষা বিষয় তাদের কারিকুলামে রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা আসায় আলিম ফলেও তার প্রভাব দেখা গেছে।

প্রফেসর এফ এম শাকিরুল্লাহ জানান, দুই বোর্ডের কারিকুলামে মূলত কোনো পার্থক্য নেই—বরং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ৪টি অতিরিক্ত বিষয়ে পরীক্ষা দেয় এবং পড়াশোনা ও ইবাদতে বেশি মনোযোগী হওয়ায় তাদের ফল ভালো হয়। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. কামরুল আহসান বলেন, দীর্ঘদিন মাদ্রাসা শিক্ষায় ‘জঙ্গি’ ট্যাগসহ নানা নেতিবাচক ধারণা ছাত্র-অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করেছিল। তবু মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও পড়াশোনাকে জীবনসংগ্রামের অংশ হিসেবে নেয়।

বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মিঞা মো. নুরুল হক জানান, মাদ্রাসা শিক্ষার মান ভালো বলেই বুয়েট, মেডিকেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সাফল্যের সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ‘আমানত’ মনে করে শিক্ষকদের নিবিড় সেবা, মোটিভেশনাল কার্যক্রম এবং ইতিবাচক পরিবেশই ফলাফলের মূল কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী ভর্তি আরও বাড়বে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় দেশজুড়ে খাল খনন বিপ্লবের ঘোষণা পানি সম্পদ মন্ত্রীর

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার উজ্জ্বল অগ্রগতি: পাসের হার–ভর্তি প্রবণতা সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন

আপডেট সময় : ০৮:২৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ বোর্ডে গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অনুত্তীর্ণ হয়েছেন ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ শিক্ষার্থী। তবে এমন ফলাফল-বিপর্যয়ের মধ্যেও বোর্ডওয়ারি পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে যেখানে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ, সেখানে আলিম পরীক্ষায় পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। কারিগরি বোর্ডেও পাসের হার ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা বোর্ডের ফল নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে দাখিল স্তরে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও কম ভর্তি হতো আলিম স্তরে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসায় এই চিত্র পাল্টে গেছে। আগামী ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে আলিম স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তি বেড়েছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছে বোর্ড। মাদ্রাসা শিক্ষার এই অগ্রগতি সামনে রেখে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে দাখিলে চালু হচ্ছে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা, যার কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক তৈরির কাজ চলছে।

বোর্ড কর্তৃপক্ষের মতে, গণঅভ্যুত্থানের আগে মাদ্রাসা শিক্ষাকে ঘিরে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চলত। ইবতেদায়ি ও দাখিলে ভর্তি স্থিতিশীল থাকলেও আলিম স্তরে শিক্ষার্থী সাধারণত কলেজে চলে যেতেন। মাদ্রাসা সনদ নিয়ে উচ্চশিক্ষায় সুযোগ কম–এমন ধারণায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা দ্বিধায় ভুগতেন। অথচ আন্দোলনের পর ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হওয়ায় ভর্তি বেড়েছে। অন্যদিকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা করেন, যা ভালো ফলাফলের অন্যতম কারণ বলে মনে করছে বোর্ড।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ১৩২ জন, পাস করেছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন। কিন্তু দুই বছর পর আলিম পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ৮৫ হাজার ৫৫৮ জন। ২০২৩ সালেও দাখিল থেকে আলিমে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় দুই লাখ। তবে গত বছরের দাখিলে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০২৬ সালের আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী। এটি আগের দুই বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

মাদ্রাসাকে নিয়ে প্রচলিত ধারণায় বলা হতো—এখানে পড়াশোনা সহজ, খাতা মূল্যায়ন উদার, কিংবা পরীক্ষাকেন্দ্র বেশি। কিন্তু বাস্তবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১৩০০ নম্বরের পাশাপাশি কোরআন, হাদিস, আরবি ও ফিকাহসহ মোট ১৭০০ নম্বরে পরীক্ষা দেয়। পাশাপাশি সাধারণ বোর্ডের মতোই সব মৌলিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ভাষা বিষয় তাদের কারিকুলামে রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা আসায় আলিম ফলেও তার প্রভাব দেখা গেছে।

প্রফেসর এফ এম শাকিরুল্লাহ জানান, দুই বোর্ডের কারিকুলামে মূলত কোনো পার্থক্য নেই—বরং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ৪টি অতিরিক্ত বিষয়ে পরীক্ষা দেয় এবং পড়াশোনা ও ইবাদতে বেশি মনোযোগী হওয়ায় তাদের ফল ভালো হয়। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. কামরুল আহসান বলেন, দীর্ঘদিন মাদ্রাসা শিক্ষায় ‘জঙ্গি’ ট্যাগসহ নানা নেতিবাচক ধারণা ছাত্র-অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করেছিল। তবু মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও পড়াশোনাকে জীবনসংগ্রামের অংশ হিসেবে নেয়।

বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মিঞা মো. নুরুল হক জানান, মাদ্রাসা শিক্ষার মান ভালো বলেই বুয়েট, মেডিকেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সাফল্যের সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ‘আমানত’ মনে করে শিক্ষকদের নিবিড় সেবা, মোটিভেশনাল কার্যক্রম এবং ইতিবাচক পরিবেশই ফলাফলের মূল কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী ভর্তি আরও বাড়বে।