ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতনের দাবিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ডাকা ‘লকডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জনমনে তীব্র উদ্বেগ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ক্ষমতাচ্যুত দলটির এই কর্মসূচিকে ‘জনজীবন জিম্মি করার অপচেষ্টা’ এবং ‘রাজনৈতিক দ্বৈত নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের দেওয়া “ঢাকা শহর দখলে থাকবে” এবং “সকাল-সন্ধ্যা লকডাউন” এর মতো হুঁশিয়ারিকে বিশ্লেষকরা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির একটি উস্কানি হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন বিরোধী দলগুলোর যেকোনো হরতাল বা অবরোধ কর্মসূচিকে তারা ‘জনবিরোধী’, ‘ধ্বংসাত্মক’ এবং ‘উন্নয়নের প্রতিবন্ধক’ হিসেবে কঠোরভাবে দমন করেছে। সে সময় এই ধরনের কর্মসূচির বিরুদ্ধে দলটির নেতারা অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের একজন অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) মন্তব্য করেন, “ক্ষমতার বাইরে গিয়েই কর্মসূচির ধরন ও ভাষা পাল্টে ফেলা রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো অভ্যাস। তবে ‘লকডাউন’-এর মতো একটি কঠোর শব্দ ব্যবহার করা, যা সাধারণত মহামারি বা জরুরি অবস্থাতেই প্রযোজ্য, এটি সাধারণ মানুষকে ভীত ও জিম্মি করার একটি কৌশল। এটি তাদের পূর্ববর্তী অবস্থানের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।”
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের কর্মসূচি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ‘লকডাউন’ সফল হলে বা একে কেন্দ্র করে সংঘাত সৃষ্টি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিশেষ করে রপ্তানি খাত ও দৈনন্দিন বাণিজ্যের ওপর।
পরিবহন খাতের এক নেতা বলেন, “আমরা যেকোনো ধরনের সংঘাতপূর্ণ কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করি। দিনের পর দিন গাড়ি বন্ধ থাকলে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী না খেয়ে থাকবে। রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতার জন্য লড়েন, কিন্তু ভুক্তভোগী হই আমরা, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।”
জাহাঙ্গীর কবির নানকের “১০ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত ঢাকা শহর দখলে থাকবে” বক্তব্যটি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা আর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শহর ‘দখল’ করার হুমকি এক জিনিস নয়।
একজন মানবাধিকার কর্মী বলেন, “যেকোনো দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার আছে, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি তা অন্য নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও জীবিকার অধিকারকে খর্ব করে, তখন তা আর গণতান্ত্রিক থাকে না, বরং নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়াতারায় পরিণত হয়।”
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াতেও হতাশার সুর স্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, তারা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। নতুন করে কোনো রাজনৈতিক সংঘাত বা জিম্মিদশার মধ্যে তারা পড়তে চান না। তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাতের পথ পরিহার করে স্থিতিশীলতা ও আলোচনার পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
রিপোর্টারের নাম 





















