ঢাকা ০১:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অর্থায়ন না পেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা জরুরি: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জোর দিয়ে বলেছেন যে, বাইরের কোনো অর্থায়ন না পেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের প্রয়োজনেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, স্থানীয় কমিউনিটির ক্ষমতায়ন এবং মানুষকে কেন্দ্রে রেখে নীতি প্রণয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) রাতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত মোভেনপিক, সেন্টোরাস-এ আয়োজিত ২৮তম সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্সের সম্মানিত অতিথিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।

উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান তাঁর বক্তব্যে বলেন, মানুষ যখন জলবায়ু বিপর্যয়ে কষ্ট পাচ্ছে এবং নিরাপদ পানি পাচ্ছে না, তখন উন্নয়নের কোনো অর্থ থাকে না। তাই তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান যেন ব্যয়বহুল বড় বড় প্রকল্পের পেছনে না ছুটে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকার, সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি খাত যদি একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের হতাশা দূর হয়ে তা ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিশালী পথে মোড় নিতে পারে। তাঁর মতে, প্রকৃত স্থিতিশীলতা এবং টিকে থাকার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে একেবারে তৃণমূল থেকে—যার ভিত্তি হবে পারস্পরিক সহযোগিতা, মানুষের আচরণগত পরিবর্তন এবং জনগণের হারানো আস্থা নতুন করে অর্জন করা।

এই প্রসঙ্গে উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন এবং সংকীর্ণ স্বার্থপরতা জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রধান কাজগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এর ফলে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার বহু সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা থেকে নেপাল পর্যন্ত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এই ধরনের অস্থিরতা আসলে শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার, অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ করার এবং তরুণ ও নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়ার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকের যুবসমাজ শুধু জলবায়ু ন্যায়বিচারই দাবি করছে না, তারা একই সঙ্গে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকারও চাইছে। যদি এখনই প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার আনা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতের পৃথিবী—যেখানে খাদ্য ও পানির সংকট বাড়বে, চরম আবহাওয়া লেগেই থাকবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটবে—তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহ্যের বাইরে চলে যাবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) এবং জলবায়ু অর্থায়নের বৈশ্বিক ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সুন্দর একটি এসডিজি মেন্যু দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অর্ডার দেওয়ার মতো সম্পদ বা অর্থ দেওয়া হয়নি।” তিনি অন্তঃসারশূন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ এবং জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ঋণ দেওয়ার যে নীতি রয়েছে, তার কঠোর সমালোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে মোট ২৩টি দেশের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান পাকিস্তানের অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট সৈয়দ ইউসুফ রাজা গিলানি। এছাড়াও সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউট (এসডিপিআই)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কিউ. সুলেরি এবং পাথ-এর এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ অঞ্চলের প্রধান নাবিল গোহীর বক্তব্য দেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

অর্থায়ন না পেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা জরুরি: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

আপডেট সময় : ০২:৫৪:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জোর দিয়ে বলেছেন যে, বাইরের কোনো অর্থায়ন না পেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের প্রয়োজনেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, স্থানীয় কমিউনিটির ক্ষমতায়ন এবং মানুষকে কেন্দ্রে রেখে নীতি প্রণয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) রাতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত মোভেনপিক, সেন্টোরাস-এ আয়োজিত ২৮তম সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্সের সম্মানিত অতিথিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।

উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান তাঁর বক্তব্যে বলেন, মানুষ যখন জলবায়ু বিপর্যয়ে কষ্ট পাচ্ছে এবং নিরাপদ পানি পাচ্ছে না, তখন উন্নয়নের কোনো অর্থ থাকে না। তাই তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান যেন ব্যয়বহুল বড় বড় প্রকল্পের পেছনে না ছুটে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকার, সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি খাত যদি একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের হতাশা দূর হয়ে তা ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিশালী পথে মোড় নিতে পারে। তাঁর মতে, প্রকৃত স্থিতিশীলতা এবং টিকে থাকার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে একেবারে তৃণমূল থেকে—যার ভিত্তি হবে পারস্পরিক সহযোগিতা, মানুষের আচরণগত পরিবর্তন এবং জনগণের হারানো আস্থা নতুন করে অর্জন করা।

এই প্রসঙ্গে উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন এবং সংকীর্ণ স্বার্থপরতা জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রধান কাজগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এর ফলে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার বহু সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা থেকে নেপাল পর্যন্ত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এই ধরনের অস্থিরতা আসলে শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার, অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ করার এবং তরুণ ও নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়ার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকের যুবসমাজ শুধু জলবায়ু ন্যায়বিচারই দাবি করছে না, তারা একই সঙ্গে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকারও চাইছে। যদি এখনই প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার আনা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতের পৃথিবী—যেখানে খাদ্য ও পানির সংকট বাড়বে, চরম আবহাওয়া লেগেই থাকবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটবে—তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহ্যের বাইরে চলে যাবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) এবং জলবায়ু অর্থায়নের বৈশ্বিক ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সুন্দর একটি এসডিজি মেন্যু দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অর্ডার দেওয়ার মতো সম্পদ বা অর্থ দেওয়া হয়নি।” তিনি অন্তঃসারশূন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ এবং জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ঋণ দেওয়ার যে নীতি রয়েছে, তার কঠোর সমালোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে মোট ২৩টি দেশের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান পাকিস্তানের অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট সৈয়দ ইউসুফ রাজা গিলানি। এছাড়াও সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউট (এসডিপিআই)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কিউ. সুলেরি এবং পাথ-এর এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ অঞ্চলের প্রধান নাবিল গোহীর বক্তব্য দেন।