দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা, মারধর ও হেনস্তার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে। সাম্প্রতিক সময়ে শরীয়তপুর, ঢাকা, পঞ্চগড় ও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় কর্মস্থলে চিকিৎসকদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। চিকিৎসক নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট, অবৈধ ক্লিনিক চক্র এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এসব হামলা বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, স্বাস্থ্যখাতে স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলামের ওপর হামলা। এর আগে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে উপ-পরিচালক ডা. আহমেদ হোসেনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সঞ্জয় কুমার রায়কে মারধর করা হয়। এছাড়া বরিশাল শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। চিকিৎসক সংগঠনগুলোর দাবি, গণমাধ্যমে আসা ঘটনাগুলোর বাইরেও উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রায়ই চিকিৎসকরা হামলা ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হাসপাতালকেন্দ্রিক টেন্ডারবাজি, আউটসোর্সিং সিন্ডিকেট এবং অবৈধ স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। তিনি জানান, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালকের ওপর হামলা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের হুমকির ঘটনাগুলোর পেছনেও এসব চক্র জড়িত থাকতে পারে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঈদের পর দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রসহ ১০ জন আনসার সদস্য ও একজন প্লাটুন কমান্ডার নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জেলা হাসপাতালগুলোতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
সরকার আরও জানিয়েছে, রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম বা ‘পাগলা ঘণ্টা’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই ব্যবস্থা চালু হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপত্তা সহায়তা পেতে ‘কোড ব্লু’ সিস্টেমও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মহাখালী এলাকায় স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে পৃথক পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান জানিয়েছেন, তিনিও উড়ো চিঠিতে হত্যার হুমকি পেয়েছেন। তার দাবি, অবৈধ হাসপাতাল বন্ধ করা, রোগী পাচার রোধ এবং টেন্ডারবাণিজ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই একটি গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকলেও চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা সীমিত। এই বাস্তবতায় নানা চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু কোনো ঘটনার তদন্তের আগেই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে জনরোষ সৃষ্টি করা এবং হামলা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
চিকিৎসক সংগঠনগুলোর মতে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে চিকিৎসকদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলেও রোগীদের উচ্চতর কেন্দ্রে রেফার করা হচ্ছে। এতে রোগীর ভোগান্তি বাড়ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক ও রোগী—উভয় পক্ষই বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। হাসপাতালের সীমিত অবকাঠামো, শয্যা সংকট এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে, যা সহিংসতায় রূপ নেয়।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল মনে করেন, চিকিৎসকদের ওপর হামলার অনেক ঘটনাই পূর্বপরিকল্পিত। তার ভাষায়, রোগীর মৃত্যুর মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে কোনো চিকিৎসকের ওপর হামলা চালানো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে এবং তা স্বাস্থ্যসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের নেতারাও বলছেন, বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণেই চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। তাদের মতে, অনেক চিকিৎসক শারীরিক ও মানসিক হেনস্তার শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতে দেশের স্বাস্থ্যখাত দক্ষ জনবল হারাচ্ছে। তারা মনে করেন, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























