ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা-২ (কেরানীগঞ্জ-সাভারের একাংশ) আসনে প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে উঠেছে। এই আসনে মাঠে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকতে দেখা যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীদের। পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড এবং তোরণে পুরো এলাকা ছেয়ে গেছে এবং দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের মধ্যেও প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আসনজুড়ে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমানউল্লাহ আমানের ছেলে ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি এবং জামায়াতের চূড়ান্ত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার তৌফিক হাসান।
যদিও ছেলে ইরফান ইবনে আমান অমি আলোচনায় রয়েছেন, তবে এলাকার সন্তান এবং সাবেক মন্ত্রী হওয়ায় আমানউল্লাহ আমানের নিজেও প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, নবগঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে প্রার্থী হতে পারেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক এবং দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। এনসিপিতে আরও দুজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও, সবমিলিয়ে এই আসনে একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আমানপুত্র অমি বর্তমানে ঢাকা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন এবং তার বড় বড় ব্যানার, ছবি ও পোস্টার ঢাকা-২ আসনজুড়ে বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার তৌফিক হাসান বুয়েটের সাবেক ছাত্র এবং এলজিইডির উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনিও বিভিন্ন কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার তোরণ, ফেস্টুন, ও ব্যানারও কম নেই। পাশাপাশি তিনি ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ছুটছেন, নারীদের নিয়ে উঠান বৈঠক করছেন এবং কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি করে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। জামায়াত প্রার্থী তৌফিক হাসান বলেন, “আমরা জয়ী হলে দেশ থেকে চাঁদাবাজি-দুর্নীতি চিরতরে মুছে ফেলবো। গ্যাস এলাকার মূল সমস্যা, এটা নিরসন করবো। আমি নিজেই ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং, সড়ক অবকাঠামো ও সেতু নির্মাণ করব।” এনসিপির প্রচারণা দৃশ্যত কম হলেও, যদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ শেষ পর্যন্ত এই আসন থেকে নির্বাচন করেন, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জমে উঠবে। এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য মো. ইমরান হোসেন জানান, দল যাকে মনোনয়ন দেবে, সবাই তার পক্ষেই কাজ করবেন।
এ আসনে বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা ধরেই নিয়েছেন যে অমিই দলের টিকিট পাচ্ছেন। তবে সম্প্রতি ফেসবুকে বিএনপির একটি খসড়া প্রার্থী তালিকা ভাইরাল হওয়ার পর আমানউল্লাহ আমানের নাম আলোচনায় আসায় পিতা নাকি পুত্র—কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা মনে করেন, এই আসনে আমানউল্লাহ আমানের কথাই শেষ কথা। কলাতিয়া বাজারের ব্যবসায়ী ফয়সাল বলেন, “আমার এলাকায় আধুনিক উন্নয়ন মানেই মন্ত্রী সাহেব। বিএনপি মানেই মন্ত্রী সাহেব, মন্ত্রী সাহেব মানেই বিএনপি।” ইরফান অমি কেরানীগঞ্জ বটিয়াকান্দি হজরতপুরের বাসিন্দা এবং এটি বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। সমর্থকরা জানিয়েছেন, আমানউল্লাহ আমান যাকে সমর্থন দেবেন, সবাই তার পক্ষেই কাজ করবেন। তরুণ এই আইনজীবী কম বয়সে সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হয়ে আলোচনা সৃষ্টি করলেও, এর আগের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মো. কামরুল ইসলামের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। জানা যায়, পরবর্তী প্রজন্মকে রাজনীতিতে সক্রিয় করতেই আমানউল্লাহ আমান ছেলেকে ঢাকা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক করে ধীরে ধীরে রাজনীতির লাইমলাইটে এনেছেন। বর্তমানে অমিকে দলের সব কর্মসূচিতে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে এবং তিনি কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।
জামায়াত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ তৌফিক হাসান কেরানীগঞ্জ মডেল থানা জামায়াতের রাজনীতি বিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা জেলা জামায়াতের মজলিসে শুরার সদস্য। তিনি দুর্নীতি-চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গ্যাস সংকট নিরসনের কথা বলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াত প্রার্থী তৌফিক হাসান জানান, তারা গণসংযোগ করছেন, নারী ভোটারদের টানতে বৈঠক করছেন এবং জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী। তিনি ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ করতে বছিলাসহ তিনটি সেতু নির্মাণেরও প্রতিশ্রুতি দেন।
এলাকাবাসীর প্রধান চাওয়া হলো, গ্যাস সমস্যার সমাধান এবং বেহাল সড়কের উন্নয়ন। বিশেষ করে, ঢাকার প্রবেশদ্বার বছিলা ব্রিজ থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত তীব্র যানজট থেকে মুক্তি চান তারা। আঁটিবাজারের ফল ব্যবসায়ী জুবায়ের হোসেন বলেন, “বছিলা ব্রিজ থেকে মোহাম্মদপুর সড়কে ভয় লাগে। যেই জয়ী হোক আমরা চাইবো এই রাস্তাটা যেন ঠিক হয়।” এছাড়া এলাকার মানুষ চাঁদাবাজি-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চান। তবে এলাকার ভোটারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ভোটাররা গোপনে কাকে ভোট দেন, সেটাও একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ খসড়া ভোটার তালিকা অনুসারে ঢাকা-২ নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫৮৯ জন। ১৯৯১ সাল থেকে অবিভক্ত কেরানীগঞ্জ আসনটি ধানের শীষের দখলে ছিল এবং প্রতিবারই আমানউল্লাহ আমান বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ২০০৮ ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনি জটিলতার কারণে আমানউল্লাহ আমানের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় ছেলে অমি ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 

























