ঢাকা ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

গোপনীয়তা উপেক্ষিত: তাড়াহুড়ো করে উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করা ‘আত্মঘাতীমূলক’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ এবং ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এবং পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বা অংশীজনের মতামত ছাড়াই উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ, হতাশা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি অবিলম্বে এই দুটি অধ্যাদেশ স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিশ্চিত করার পরই কেবল পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান শনিবার (১১ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, আগের কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে উপাত্ত সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ ছিল, কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিল। তবে, এবার অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার সব গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা ও ঝুঁকি সংক্রান্ত পরামর্শ উপেক্ষা করে সর্বশেষ খসড়াটি অংশীজনদের না জানিয়ে গোপনীয়তার আশ্রয় নিয়ে অনুমোদন করিয়েছে, যা খুবই নিন্দনীয়।

ড. জামান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, অনুমোদিত খসড়ায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত উপাত্ত সুরক্ষার মৌলিক নীতিগুলো, যেমন—আইনসম্মততা, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা, তথ্যের ন্যূনতম ব্যবহার, নির্ভুলতা এবং জবাবদিহিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হয় বাদ দেওয়া হয়েছে, নয়তো কার্যত ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এই নীতিগুলোই আইনের প্রাণ, আর এগুলো বাদ দিয়ে আইনটিকে শুরুতেই ‘প্রাণহীন ও খোঁড়া’ করে দেওয়ার মতো অভাবনীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করা হয়েছে। টিআইবির হাতে আসা খসড়া অনুযায়ী, উপাত্ত-জিম্মাদার ও প্রক্রিয়াকারীকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে ছাড় দেওয়ার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তাকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বললেও কম বলা হয়। এছাড়া, ধারা ২৪-এ ‘অপরাধ প্রতিরোধের’ নামে ব্যক্তিগত উপাত্তে ঢালাওভাবে সরকারি প্রবেশাধিকারের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ড. জামানের প্রশ্ন— কোন বিবেচনায় বা উদ্দেশ্যে উপাত্ত সুরক্ষার নামে এই অধ্যাদেশে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির বিধানগুলো বহাল রাখা হলো?

জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের স্বার্থরক্ষার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের যে এখতিয়ার বহাল রাখা হয়েছে, তাতে বিচারবিভাগীয় তদারকি ছাড়া সরকারি সংস্থাগুলো ডেটা সার্ভারে অবাধ প্রবেশাধিকার পেলে তার অপব্যবহারের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, আইনের মূল চেতনা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত সাংবিধানিক অঙ্গীকার এতে প্রতিফলিত হয়নি। টিআইবি আরও মনে করে, তথ্যের অপব্যবহারকে ফৌজদারি অপরাধে রূপ দেওয়ার বিষয়টি ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা ঠিকমতো বিবেচনা করা হয়নি। একইভাবে, উপাত্ত সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবিও সরকার মানেনি।

ড. জামান আরও জানান, সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে এবং বৈশ্বিক চর্চার পরিপন্থী হিসেবে তৈরি করা ‘উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়াটিও কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়াই অনুমোদন করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশ, যা তথাকথিত আন্তঃপরিচালন (Inter-operability) কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলে, তা বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাপক ঝুঁকি ও ‘আত্মঘাতী পরিণতি’ নিয়ে আসবে। দুঃখজনক হলো, সরকারি ও আমলাতান্ত্রিক পরিসরের বাইরে বৃহত্তর অংশীজনদের কাছ থেকে এই অধ্যাদেশ সম্পর্কে কোনো মতামত নেওয়ার বা বিবেচনা করার ন্যূনতম চেষ্টা দেখা যায়নি, যা কর্তৃত্ববাদী শাসনের হতাশাজনক উদাহরণ। টিআইবি মনে করে, ডিজিটাল জগতে আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তবে বিদ্যমান ব্যবস্থার সমস্যা চিহ্নিত না করে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের প্রথম থেকেই অন্তর্ভুক্ত না করে তাড়াহুড়ো করে কেবল একটি বা দুটি আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করলে বরং নতুন জটিলতা বাড়বে। এতে জনগণের অধিকারহরণ এবং ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথ্যের ওপর সরকারি নজরদারির ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তাই টিআইবি অধ্যাদেশ দুটি কার্যকর করা থেকে বিরত থেকে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সংশোধনের পরই তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার পদধ্বনি: আইএমএফের সতর্কবার্তা

গোপনীয়তা উপেক্ষিত: তাড়াহুড়ো করে উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করা ‘আত্মঘাতীমূলক’

আপডেট সময় : ০৩:৫০:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ এবং ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এবং পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বা অংশীজনের মতামত ছাড়াই উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ, হতাশা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি অবিলম্বে এই দুটি অধ্যাদেশ স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিশ্চিত করার পরই কেবল পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান শনিবার (১১ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, আগের কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে উপাত্ত সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ ছিল, কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিল। তবে, এবার অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার সব গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা ও ঝুঁকি সংক্রান্ত পরামর্শ উপেক্ষা করে সর্বশেষ খসড়াটি অংশীজনদের না জানিয়ে গোপনীয়তার আশ্রয় নিয়ে অনুমোদন করিয়েছে, যা খুবই নিন্দনীয়।

ড. জামান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, অনুমোদিত খসড়ায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত উপাত্ত সুরক্ষার মৌলিক নীতিগুলো, যেমন—আইনসম্মততা, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা, তথ্যের ন্যূনতম ব্যবহার, নির্ভুলতা এবং জবাবদিহিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হয় বাদ দেওয়া হয়েছে, নয়তো কার্যত ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এই নীতিগুলোই আইনের প্রাণ, আর এগুলো বাদ দিয়ে আইনটিকে শুরুতেই ‘প্রাণহীন ও খোঁড়া’ করে দেওয়ার মতো অভাবনীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করা হয়েছে। টিআইবির হাতে আসা খসড়া অনুযায়ী, উপাত্ত-জিম্মাদার ও প্রক্রিয়াকারীকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে ছাড় দেওয়ার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তাকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বললেও কম বলা হয়। এছাড়া, ধারা ২৪-এ ‘অপরাধ প্রতিরোধের’ নামে ব্যক্তিগত উপাত্তে ঢালাওভাবে সরকারি প্রবেশাধিকারের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ড. জামানের প্রশ্ন— কোন বিবেচনায় বা উদ্দেশ্যে উপাত্ত সুরক্ষার নামে এই অধ্যাদেশে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির বিধানগুলো বহাল রাখা হলো?

জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের স্বার্থরক্ষার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের যে এখতিয়ার বহাল রাখা হয়েছে, তাতে বিচারবিভাগীয় তদারকি ছাড়া সরকারি সংস্থাগুলো ডেটা সার্ভারে অবাধ প্রবেশাধিকার পেলে তার অপব্যবহারের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, আইনের মূল চেতনা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত সাংবিধানিক অঙ্গীকার এতে প্রতিফলিত হয়নি। টিআইবি আরও মনে করে, তথ্যের অপব্যবহারকে ফৌজদারি অপরাধে রূপ দেওয়ার বিষয়টি ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা ঠিকমতো বিবেচনা করা হয়নি। একইভাবে, উপাত্ত সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবিও সরকার মানেনি।

ড. জামান আরও জানান, সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে এবং বৈশ্বিক চর্চার পরিপন্থী হিসেবে তৈরি করা ‘উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়াটিও কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়াই অনুমোদন করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশ, যা তথাকথিত আন্তঃপরিচালন (Inter-operability) কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলে, তা বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাপক ঝুঁকি ও ‘আত্মঘাতী পরিণতি’ নিয়ে আসবে। দুঃখজনক হলো, সরকারি ও আমলাতান্ত্রিক পরিসরের বাইরে বৃহত্তর অংশীজনদের কাছ থেকে এই অধ্যাদেশ সম্পর্কে কোনো মতামত নেওয়ার বা বিবেচনা করার ন্যূনতম চেষ্টা দেখা যায়নি, যা কর্তৃত্ববাদী শাসনের হতাশাজনক উদাহরণ। টিআইবি মনে করে, ডিজিটাল জগতে আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তবে বিদ্যমান ব্যবস্থার সমস্যা চিহ্নিত না করে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের প্রথম থেকেই অন্তর্ভুক্ত না করে তাড়াহুড়ো করে কেবল একটি বা দুটি আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করলে বরং নতুন জটিলতা বাড়বে। এতে জনগণের অধিকারহরণ এবং ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথ্যের ওপর সরকারি নজরদারির ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তাই টিআইবি অধ্যাদেশ দুটি কার্যকর করা থেকে বিরত থেকে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সংশোধনের পরই তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছে।