ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী এলাকায় কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের জড়ো করা এবং তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রচেষ্টা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের হাকিমপুর এলাকায় কয়েকশ মানুষকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ পরিচয়ে একত্রিত করার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমান্ত দিয়ে কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর বা জোরপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে অনেক মানুষকে জড়ো হতে দেখা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তারা বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন এবং এখন তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। নথিপত্র যাচাইয়ের পর তাদের স্থানীয় হোল্ডিং সেন্টার বা আটক কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
কিছু ভারতীয় ও বাংলাদেশি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইতোমধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। তবে এ ধরনের তথ্যের সত্যতা অস্বীকার করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এবং স্থানীয় প্রশাসন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর কিংবা জোর করে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি।
বিবিসির সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সীমান্তের ভারতীয় অংশে অনেক ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন নথি পরীক্ষা করে নাম-পরিচয় ও বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঠিকানা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। এরপর সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় অপেক্ষা করানো হচ্ছে অথবা হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তবে তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর পদ্ধতি সম্পর্কে ভারতীয় প্রশাসন বা বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
এদিকে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার কাকডাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা বলছেন, সীমান্তের ওপারে মানুষের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ অংশে শত শত মানুষের প্রবেশ বা পুশ-ইনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী কেরাগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন হাবিল জানান, ভারতের হাকিমপুরে মানুষের জড়ো হওয়ার খবর তিনি শুনেছেন, তবে বাংলাদেশে প্রবেশের কোনো তথ্য তার কাছে নেই। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন। তিনি বলেন, সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং পুলিশও নজরদারি জোরদার করেছে।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজও জানিয়েছেন, সীমান্তে পুশ-ইনের কিছু চেষ্টা হলেও তা সফল হয়নি। তার মতে, বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত এলাকা থেকেও। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত থেকে কাউকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে—এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
বিজিবির পক্ষ থেকেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান বলেন, ঈদের আগে ২৬ মে সীমান্ত দিয়ে কিছু মানুষকে পুশ-ইনের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু বিজিবির হস্তক্ষেপে তা ব্যর্থ হয়। এরপর আর কোনো প্রচেষ্টা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হলে সেটি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয় এবং গোপনে এমন কিছু ঘটার সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতির পেছনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলোচনায় এসেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করার পর থেকেই সীমান্তে এ ধরনের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা বাড়ে। যদিও বাস্তবে কতজন বাংলাদেশি এবং তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। কারণ অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মানবিক বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের উত্তেজনা ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন ও বিজিবি।
রিপোর্টারের নাম 
























