পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটন জেলা খাগড়াছড়িতে নেমেছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের ঢল। মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি, ঝর্ণার কলতান, রহস্যময় গুহা এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক ছুটে এসেছেন এই পাহাড়ি জনপদে। ঈদের প্রথম দিন থেকেই জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের নিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে আসা পর্যটকদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। জেলার অন্যতম আকর্ষণ আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র, রহস্যময় আলুটিলা গুহা, তেরাং তৈকালাই ঝর্ণা, জেলা পরিষদ পার্ক এবং চেঙ্গী নদীর পাড় এখন দর্শনার্থীদের কোলাহলে মুখর।
সবুজে মোড়ানো পাহাড়ের সারি, শীতল বাতাস আর নিরিবিলি পরিবেশ ভ্রমণকারীদের দিচ্ছে প্রশান্তির অনুভূতি। নগরজীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে এসে অনেকেই প্রকৃতির মাঝে নিজেদের নতুন করে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে আলুটিলা গুহা। অন্ধকারে ঘেরা প্রাকৃতিক এই গুহার ভেতর টর্চের আলোয় পথচলা অনেকের কাছেই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। গুহার ভেতরের শীতল পরিবেশ, সরু পথ এবং রহস্যময় আবহ ভ্রমণপ্রেমীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করছে। অনেক পর্যটক গুহার সামনে ছবি তুলছেন, পাহাড়ি পথে হাঁটছেন এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সময় কাটাচ্ছেন।
কুমিল্লা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক পর্যটক জানান, খাগড়াছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে আগে অনেক শুনেছেন, তবে সরাসরি এসে তার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালো লেগেছে। বিশেষ করে আলুটিলা গুহার অভিজ্ঞতা তাদের পরিবারের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
খাগড়াছড়ির আরেক জনপ্রিয় গন্তব্য তেরাং তৈকালাই ঝর্ণাও পর্যটকদের ভিড়ে সরগরম। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, চারপাশের সবুজ প্রকৃতি এবং ঝুলন্ত সেতুর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে। অনেকেই ঝর্ণার পাশে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন।
ফেনী থেকে আসা একদল পর্যটক জানান, পাহাড়, ঝর্ণা, স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ি তাদের কাছে অসাধারণ লেগেছে। তাদের মতে, তেরাং তৈকালাই ঝর্ণার সৌন্দর্য এবং শান্ত পরিবেশ বারবার ফিরে আসার মতো আকর্ষণ তৈরি করেছে।
ঈদের ছুটিতে চেঙ্গী নদীর পাড়েও দেখা গেছে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি। পাহাড়ঘেরা নদীর স্বচ্ছ জলধারা, বিকেলের মৃদু বাতাস এবং নৈসর্গিক পরিবেশ অনেককে টেনে এনেছে সেখানে। কেউ পরিবার নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ আবার নৌভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করছেন।
পর্যটকদের আগমনে খাগড়াছড়ির স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোতে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় তাদের ব্যবসাও জমে উঠেছে।
পর্যটকদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনও সক্রিয় রয়েছে। খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দর্শনার্থীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। খাগড়াছড়ি ট্যুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে জেলা পুলিশও ঈদ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং পাহাড়ি আতিথেয়তার অনন্য সমন্বয়ে খাগড়াছড়ি এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের ছুটিতে হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলো। পাহাড়ের সৌন্দর্য, ঝর্ণার সুর, গুহার রহস্য আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে খাগড়াছড়ি যেন পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত উৎসবের নগরীতে, যেখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত পর্যটকদের মনে দীর্ঘদিন ধরে স্মৃতি হয়ে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 

























