বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে নারীদের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। মাঠে ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে ঘরের ভেতর কৃষি-সম্পর্কিত অসংখ্য কাজে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কৃষির মূল চালিকাশক্তি হয়েও অধিকাংশ নারী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি পান না। জমির মালিকানা, কৃষি ঋণ, সরকারি সহায়তা, কৃষক কার্ড কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন কাঠামোতে তাদের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত।
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার নার্গিস বেগমের জীবন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। স্বামীর সঙ্গে মাঠে কাজ করা, ধান কাটা, খড় ঝাড়া, ফসল বহন করা থেকে শুরু করে ঘরের রান্না, সন্তান লালন-পালন ও গবাদিপশুর দেখাশোনা—সব দায়িত্বই পালন করেন তিনি। অথচ নিজের শ্রমের জন্য আলাদা কোনো পারিশ্রমিক বা স্বীকৃতির কথা কখনও ভাবেননি। কৃষিকাজে সরকারি সহায়তা পান কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তার সহজ জবাব, সবকিছুই নিজেদের সামর্থ্যে করতে হয়।
অন্যদিকে শাহনাজ বেগমের গল্প কিছুটা ভিন্ন। স্বামী হারানোর পর সন্তানদের নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এই নারী কৃষক বর্গা জমিতে চাষাবাদ করেন, হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করেন। স্থানীয় একটি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পাওয়ার পর তার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, কৃষি বিষয়ে জ্ঞানও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তিনিও স্বীকার করেন, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার আগে কৃষক হিসেবে নিজের অবস্থান নিয়ে সচেতন ছিলেন না।
কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার কৃষকের মধ্যে নারী কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক চার হাজার। অর্থাৎ মোট কৃষকের প্রায় ১০ শতাংশ নারী। তবে জমির মালিকানার ক্ষেত্রে চিত্র আরও বৈষম্যমূলক। অনেক নারী মাঠে কাজ করলেও জমির মালিকানা থাকে স্বামী, বাবা বা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের নামে। ফলে কৃষি ঋণ, ভর্তুকি বা সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা নানা জটিলতায় পড়েন।
স্থানীয় নারী কৃষকদের অভিযোগ, নিজের নামে জমি না থাকায় ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় তারা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার বা ক্ষুদ্র প্রকল্পের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে পুরুষরা যখন নদীতে মাছ ধরতে যান, তখন কৃষি ও গৃহস্থালির বড় অংশের দায়িত্ব নারীদের কাঁধেই এসে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে নারীদের শ্রমকে এখনো ‘ঘরের কাজ’ হিসেবে দেখা হয়। গরুর খাদ্য প্রস্তুত করা, ধান শুকানো, মাড়াই করা, বীজ সংরক্ষণ, হাঁস-মুরগি পালন কিংবা খাদ্যশস্য সংরক্ষণ—এসব কাজ কৃষি উৎপাদনের অংশ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় না। ফলে কৃষিতে নারীর প্রকৃত অবদান পরিসংখ্যান ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়।
এদিকে নারী কৃষকদের জন্য আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তন। ভোলার চরাঞ্চলে জোয়ারের পানি, লবণাক্ততা এবং আগাম বন্যার কারণে নিয়মিত ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। ফসল নষ্ট হলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, ঋণ পরিশোধ এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে। একইসঙ্গে লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে নারীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যারও মুখোমুখি হচ্ছেন।
নারী কৃষকদের জীবনের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো অবৈতনিক যত্নশ্রম। মাঠে কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে রান্না, পানি সংগ্রহ, সন্তান ও বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা, জ্বালানি সংগ্রহ, খাদ্য সংরক্ষণসহ অসংখ্য দায়িত্ব পালন করেন তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈতনিক গৃহস্থালি শ্রম থেকে আসে, যার বড় অংশই নারীরা সম্পাদন করেন। তবুও এই শ্রম অর্থনৈতিক স্বীকৃতি পায় না।
কৃষকদের জন্য চালু হওয়া ডিজিটাল কৃষক কার্ড নিয়েও নারী কৃষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই জানতে চান, জমির মালিকানা না থাকলেও তারা কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন কি না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠে যারা বাস্তবে কৃষিকাজ করছেন, তারা নারী বা পুরুষ যেই হোন না কেন, কৃষক কার্ড পাওয়ার সুযোগ থাকবে। বর্তমানে কৃষক কার্ড কার্যক্রম পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে নারী কৃষকদের তথ্য ও অংশগ্রহণ আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে কৃষিতে নিয়োজিত নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি হলেও কৃষিজমির মালিকানা তাদের হাতে অত্যন্ত কম। ফলে মাঠের শ্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও কৃষি পরিকল্পনা, সহায়তা বণ্টন এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নারীরা প্রায় অনুপস্থিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী কৃষকদের প্রকৃত স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হলে শুধু প্রশিক্ষণ বা ক্ষুদ্র সহায়তা নয়, জমির মালিকানা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, কৃষক কার্ড, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তাদের অবৈতনিক শ্রমের মূল্যায়ন এবং জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়গুলোও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পেতে হবে। তবেই কৃষিতে নারীর অবদান দৃশ্যমান হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা যথাযথ মর্যাদা পাবে।
রিপোর্টারের নাম 

























