ঢাকা ০২:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে উল্লাস: সমাজের মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব

মানুষের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা মানব সমাজের এক চিরন্তন রীতি। আত্মীয় বা পরিচিত না হলেও, এমনকি সম্পূর্ণ অপরিচিত কারও মৃত্যু সংবাদ শুনলেও আমরা অবচেতনভাবেই দুঃখিত হই এবং ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে উঠি। একসময় আমাদের সমাজে এই সহানুভূতিই ছিল স্বাভাবিক সংস্কৃতি।

কিন্তু আজ যখন কারও মৃত্যু উল্লাসের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে সমাজ এক অদৃশ্য ও ভয়াবহ মহামারিতে আক্রান্ত। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অন্ধকার উল্লাসের নাম ‘শ্যাডনফ্রয়েড’। শ্যাডনফ্রয়েড একটি জার্মান শব্দ, যার অর্থ—কারও ক্ষতি, পতন বা বিপদে অবচেতনভাবে আনন্দ পাওয়া। সহজ ভাষায়, কোনো জনপ্রিয় বা সফল ব্যক্তি যখন বিতর্কে জড়ান বা মারা যান, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের গোপন তৃপ্তি বা ‘বেশ হয়েছে’ ভাব আসাটাই শ্যাডনফ্রয়েড।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ড. রিচার্ড এইচ. স্মিথ একে ব্যাখ্যা করেছেন মানুষের সামাজিক তুলনা এবং আত্মমর্যাদাবোধের অভাব দিয়ে। যখন মানুষ নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে এবং হীনম্মন্যতায় ভোগে, তখন অন্য কোনো সফল মানুষের পতন দেখলে তার অবচেতন মন স্বস্তি পায়। এটি তার ভেতরের হীনম্মন্যতাকে সাময়িকভাবে উপশম দেয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখানেই থেমে নেই। সাইকোলজির পরিভাষায় ‘স্যাডিজম’ নামক ধারণাটি শ্যাডনফ্রয়েডের চেয়েও বেশি হিংস্র। শ্যাডনফ্রয়েডে মানুষ পরোক্ষ আনন্দ পায়, কিন্তু স্যাডিজমে মানুষ সক্রিয় হয়ে ওঠে, অন্যকে কষ্ট দিয়ে, অপমান করে বা নির্যাতন চালিয়ে বিকৃত আনন্দ লাভ করে।

কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে যে ধরনের কুৎসিত ট্রল ও উল্লাস হচ্ছে, তা দেখে প্রশ্ন জাগে—আমরা কোন যুগে বাস করছি? আমরা কি কেবল শ্যাডনফ্রয়েডের স্তরেই আটকে আছি, নাকি ধীরে ধীরে হিংস্র ‘স্যাডিস্টে’ পরিণত হচ্ছি? কারিনা কায়সার অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই এই মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির চরম রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদপুরে ২৪ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৫ জনের

কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে উল্লাস: সমাজের মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব

আপডেট সময় : ১০:০৬:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

মানুষের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা মানব সমাজের এক চিরন্তন রীতি। আত্মীয় বা পরিচিত না হলেও, এমনকি সম্পূর্ণ অপরিচিত কারও মৃত্যু সংবাদ শুনলেও আমরা অবচেতনভাবেই দুঃখিত হই এবং ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে উঠি। একসময় আমাদের সমাজে এই সহানুভূতিই ছিল স্বাভাবিক সংস্কৃতি।

কিন্তু আজ যখন কারও মৃত্যু উল্লাসের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে সমাজ এক অদৃশ্য ও ভয়াবহ মহামারিতে আক্রান্ত। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অন্ধকার উল্লাসের নাম ‘শ্যাডনফ্রয়েড’। শ্যাডনফ্রয়েড একটি জার্মান শব্দ, যার অর্থ—কারও ক্ষতি, পতন বা বিপদে অবচেতনভাবে আনন্দ পাওয়া। সহজ ভাষায়, কোনো জনপ্রিয় বা সফল ব্যক্তি যখন বিতর্কে জড়ান বা মারা যান, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের গোপন তৃপ্তি বা ‘বেশ হয়েছে’ ভাব আসাটাই শ্যাডনফ্রয়েড।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ড. রিচার্ড এইচ. স্মিথ একে ব্যাখ্যা করেছেন মানুষের সামাজিক তুলনা এবং আত্মমর্যাদাবোধের অভাব দিয়ে। যখন মানুষ নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে এবং হীনম্মন্যতায় ভোগে, তখন অন্য কোনো সফল মানুষের পতন দেখলে তার অবচেতন মন স্বস্তি পায়। এটি তার ভেতরের হীনম্মন্যতাকে সাময়িকভাবে উপশম দেয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখানেই থেমে নেই। সাইকোলজির পরিভাষায় ‘স্যাডিজম’ নামক ধারণাটি শ্যাডনফ্রয়েডের চেয়েও বেশি হিংস্র। শ্যাডনফ্রয়েডে মানুষ পরোক্ষ আনন্দ পায়, কিন্তু স্যাডিজমে মানুষ সক্রিয় হয়ে ওঠে, অন্যকে কষ্ট দিয়ে, অপমান করে বা নির্যাতন চালিয়ে বিকৃত আনন্দ লাভ করে।

কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে যে ধরনের কুৎসিত ট্রল ও উল্লাস হচ্ছে, তা দেখে প্রশ্ন জাগে—আমরা কোন যুগে বাস করছি? আমরা কি কেবল শ্যাডনফ্রয়েডের স্তরেই আটকে আছি, নাকি ধীরে ধীরে হিংস্র ‘স্যাডিস্টে’ পরিণত হচ্ছি? কারিনা কায়সার অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই এই মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির চরম রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম।