দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসা করা হকারদের নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসনের জন্য সরকার প্রথমবারের মতো ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এর লক্ষ্য হলো পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করা, নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং হকারদের বৈধ কাঠামোর মধ্যে আনা। তবে বিশেষজ্ঞ ও হকারদের একটি বড় অংশ এখনো এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।
নতুন নীতিমালায় কী রয়েছে?
নীতিমালা অনুযায়ী হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। একটি পরিবারের একজনের বেশি লাইসেন্স দেওয়া হবে না এবং লাইসেন্স হস্তান্তরযোগ্য হবে না। নিয়ম ভঙ্গ করলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন না করলে নিবন্ধন বাতিল করা যাবে। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধান সড়কের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সড়ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মেট্রো স্টেশন, বাসস্টপ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে হকার জোন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পথচারীদের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৮ ফুট জায়গা খালি রাখতে হবে।
নাইট মার্কেট ও হলিডে মার্কেট
মিরপুর, গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, সদরঘাট ও বায়তুল মোকাররম এলাকার মতো ব্যস্ত স্থানে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নাইট মার্কেট পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হলিডে মার্কেট চালুর বিধান রাখা হয়েছে।
ইতোমধ্যে পরিচয়পত্র বিতরণ শুরু
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে কয়েকশ হকারকে কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিয়েছে। ডিএসসিসি গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররম ও শাজাহানপুর এলাকায় কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে ডিএনসিসি মিরপুর-১ ও মিরপুর-১০ এলাকার হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ করেছে।
অনিয়মের অভিযোগ
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের নেতারা অভিযোগ করেছেন, প্রকৃত হকার যাচাই ছাড়াই অনেকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অনেক হকার দাবি করেছেন, কারা তালিকা তৈরি করেছে বা কীভাবে নির্বাচন হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের কাছে পরিষ্কার কোনো তথ্য নেই। তবে সিটি করপোরেশন বলছে, পুলিশ ও প্রশাসনের যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই তালিকা করা হয়েছে।
হকারদের আপত্তি কোথায়?
অনেক হকার নির্ধারিত পুনর্বাসন এলাকায় যেতে অনাগ্রহী। তাদের আশঙ্কা, নতুন স্থানে ক্রেতা কম থাকবে এবং ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে মিরপুর ও গুলিস্তান এলাকার অনেক হকার জানিয়েছেন, কোরবানির ঈদ পর্যন্ত তারা বর্তমান অবস্থানেই থাকতে চান। এরপর কী হবে, সে বিষয়ে তারা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
পথচারীদের দৃষ্টিভঙ্গি
ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে থাকা পথচারীরা মনে করেন, শুধু নীতিমালা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের মতে, অতীতেও এমন অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু স্থায়ী ফল আসেনি। ফুটপাত জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার ওপর তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ মনে করেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ফুটপাত কখনোই হকারদের দখলে যেতে দেওয়া উচিত নয়। তবে সন্ধ্যার পর তুলনামূলক কম ব্যবহৃত কিছু সড়কে সীমিত সময়ের জন্য পরিকল্পিত নাইট মার্কেট চালুর সুযোগ থাকতে পারে। অন্যদিকে আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, শুধু পরিচয়পত্র বিতরণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত হকার কে, আর কারা হকারদের নামে জায়গা দখল করে চাঁদাবাজি করছে— সেই প্রশ্নের সমাধান ছাড়া টেকসই ফল পাওয়া কঠিন। তিনি প্রকৃত দরিদ্র হকারদের সামাজিক সুরক্ষা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
এই উদ্যোগ সফল হওয়ার জন্য তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে—
১। প্রকৃত হকারদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা।
২। পুনর্বাসন এলাকায় পর্যাপ্ত ক্রেতা ও ব্যবসার সুযোগ নিশ্চিত করা।
৩। রাজনৈতিক প্রভাব, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উচ্ছেদ নয়, বরং পরিকল্পিত পুনর্বাসন, কঠোর তদারকি এবং পথচারীদের অধিকার নিশ্চিত করা গেলে এই নীতিমালা কার্যকর হতে পারে। অন্যথায় অতীতের অনেক উদ্যোগের মতো এটিও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























