স্মৃতিচারণ, আবৃত্তি, গান, নাচ, নাট্যাংশ ও আবেগঘন কথামালায় স্মরণ করা হলো বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের অবিস্মরণীয় নাম, মঞ্চসারথি প্রয়াত আতাউর রহমানকে। গতকাল শনিবার (২৩ মে) সন্ধ্যায় রাজধানীর বেইলি রোডের বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহীম মিলনায়তনে এই গুণী নাট্যজনের স্মরণে এক যৌথ সভার আয়োজন করা হয়। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই) বাংলাদেশ কেন্দ্র যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা প্রয়াত আতাউর রহমানের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। এরপর আলো-অন্ধকারের মঞ্চে আতাউর রহমানের নিজের কণ্ঠে ধারণকৃত কবিতার অংশবিশেষ বাজিয়ে শোনানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল পর্ব।
আয়োজনের শুরুতেই ফারহিন খান জয়িতা নিজের কণ্ঠে একক সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর মুখবন্ধ পাঠ করেন নাসিরুল হক খোকন এবং আতাউর রহমানকে উৎসর্গ করে শংসাবচন পাঠ করেন নাসীর উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু।
সংগীত পরিবেশন করছেন ফারহিন খান জয়িতা স্মরণসভার আলোচনায় অংশ নিয়ে আতাউর রহমানের সহধর্মিণী শাহিদা রহমান তাঁর জীবনের নানা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। বরেণ্য নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার তাঁর নির্দেশনার বৈচিত্র্য তুলে ধরে বলেন, “তিনি নাটকে নির্দেশনা দিয়েছেন নিজের দলে এবং বাইরে। তাঁর প্রিয় নাট্যকার—স্বদেশে সৈয়দ শামসুল হক, যাঁর অনেক নাটক তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপর রবীন্দ্রনাথ, শেকসপিয়র…” বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ তাঁর বক্তব্যে আতাউর রহমানের সাংগঠনিক দক্ষতা ও দেশের থিয়েটার আন্দোলনে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন।
নাসির উদ্দিন ইউসুফ স্মরণসভার মাঝেই আতাউর রহমান নির্দেশিত ও অভিনীত কালজয়ী নাটক ‘নূরলদীনের সারা জীবন’-এর ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর মঞ্চে এসে স্মৃতিচারণ করেন নাট্যজন সারা যাকের। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “উনি নাটক চটপট করার যেমন একটা মানুষ হয়েছিলেন, পাশাপাশি উনি একজন অত্যন্ত সৎ মানুষ ছিলেন। সংস্কৃতি জগতের লোকরা নানারকম কথার সম্মুখীন হচ্ছে। সেখানে আতাউর ভাই যেমন একটা জায়গায় ছিলেন, ওনার যে ঐতিহ্য, সে জায়গাটা ধরে রাখতে পেরেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “যে সত্যি করে শিল্পচর্চা করে, নাটক করে, সে আসলে সত্যের সন্ধানী। সে কোনো সময় অসৎ কাজ করতে পারে না।”
সারা জাকের অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন লাকী ইনাম এবং বক্তব্য রাখেন মফিদুল হক। এরপর মঞ্চে এক আবেগঘন আবহে পাঠাভিনয় পরিবেশন করেন বিশিষ্ট অভিনেতা তারিক আনাম খান। আলোচনা পর্বে আরও বক্তব্য রাখেন কামাল বায়েজিদ এবং আবদুস সেলিম। পরে মঞ্চে কবিতা আবৃত্তি করেন গোলাম সারোয়ার। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তামান্না রহমানের চমৎকার নৃত্য পরিবেশনা।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ভাগে আতাউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ নাটকের ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয়। এরপর আলোচনায় অংশ নেন দেবপ্রসাদ দেবনাথ এবং কেরামত মাওলা। পরে মঞ্চে প্রদর্শিত হয় তাঁর নির্দেশিত আরেকটি বিখ্যাত নাটক ‘রক্তকরবী’র ভিডিওচিত্র। এরপর কবিতা পাঠ করেন ত্রপা মজুমদার এবং বক্তব্য রাখেন শর্মিষ্ঠা রহমান।
লাকি ইনাম অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মঞ্চে একটি বিশেষ নাট্যাংশ পরিবেশিত হয়, তারিক আনামের কন্ঠে যেখানে উচ্চারিত হয়—“আমার ভেতর লড়াই করতে করতে আমার হাত পা ভেঙে গেছে… আমার ধমনীর মেঘে মেঘে ও অন্ধ, তুমি ছিলে বড়ই কৃপণ… আমাকে মারো তুমি মারো, সম্পূর্ণ মারো। তাতেই আমার মুক্তি।” এই প্রতীকী ও প্রতিবাদী সংলাপ যেন আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, তাঁর নাট্যদর্শন কেবল অভিনয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের ভেতরের সত্য ও মানবিক বোধকে জাগিয়ে তোলার হাতিয়ার।
আবুল হায়াত সবশেষে অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য দেন প্রবীণ অভিনেতা ও নাট্যজন আবুল হায়াত। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, আতাউর রহমানের রেখে যাওয়া আদর্শ, কর্মপ্রেরণা এবং নাটকের প্রতি দায়বদ্ধতা আগামী প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের প্রতিনিয়ত পথ দেখাবে এবং অনুপ্রেরণা জোগাবে।
ব্রেকিং নিউজ::
মঞ্চসারথি আতাউর রহমানকে স্মরণ: বেইলি রোডে আবেগঘন আয়োজন
-
রিপোর্টারের নাম - আপডেট সময় : ০২:১২:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
- ৩ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























