ঢাকা ০৪:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

নজরুলের শ্যামাসংগীতে ভক্তির ভিন্ন রূপ: মায়ের অধিক মেয়ে রূপে শ্যামা

বাঙালি হিন্দুর আরাধ্যা দেবী কালী, যিনি শ্মশানবাসিনী ও রুদ্ররূপা হিসেবে পরিচিত, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের হাত ধরে প্রথম ঘরে উঠেছিলেন। তাঁর সেই উগ্ররূপ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল শুভ্রহাসি ও চন্দ্রকান্তি নিয়ে, ধারণ করেছিল বাৎসল্যরূপ। পরবর্তীতে বাঙালি কবি রামপ্রসাদ ভক্তিনয়ন দিয়ে কালীর দিকে তাকিয়ে তাকে কখনো মা, কখনো শ্যামা, আবার কখনো কন্যারূপে দেখেছেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন রামপ্রসাদের সারস্বত-সাধনার কাব্যসরস্বতী। একই ধারায় পরবর্তীকালের সাধক কমলাকান্তও অসংখ্য শাক্তপদ রচনা করেছেন।

রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের পর, কাজী নজরুল ইসলামই সেই শ্যামাভক্ত কবি, যিনি তাঁর রুদ্রলেখায় ভক্তির গভীর থেকে সংগীতের লিপিমালা তুলে এনেছেন। নজরুল শ্যামাকে ঘরের মেয়ে করে তুলেছেন, অনুরাগে শাসন করেছেন এবং অভিমানে মুখ ফিরিয়েছেন। তাঁর বাৎসল্য তাঁকে এই অধিকার দিয়েছে, যেন শ্যামা তাঁর মায়েরও অধিক মেয়ে। যখন নজরুল গেয়ে ওঠেন, “আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে (মাকে) কে দিয়েছে গালি?/ রাগ ক’রে সে সারা গায়ে মেখেছে তাই কালি।” তখন মনে হয় যেন রাঢ়-বঙ্গের কোনো অবাধ্যবালিকা, পড়শির কটুকথা সইতে না পেরে লজ্জায়-অভিমানে সারা গায়ে কালি মেখে নলখাগড়ার বনে লুকিয়ে আছে।

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল সেই রণরঙ্গিণীর সন্তানই নন, তিনি শ্যামার ব্যথারও দরদী; তাঁর দুঃখরাতের সান্ত্বনা, তাঁর কিশোরীচিত্তের লজ্জা ও মান লুকোনোর আশ্রয়। কালীর সংগীতে এই ধরনের বাৎসল্য পূর্বে কোথাও দেখা যায় না। ব্রজগোপীর হোলি খেলার মধ্যে যেই সখ্য-শৃঙ্গার ধরা পড়ে, বাৎসল্য তার নিকটবর্তী। কাজী নজরুল ইসলাম চিরদিন রুদ্র থেকে বাৎসল্যেই যেতে চেয়েছেন; রুদ্র তাঁর বহিরঙ্গ, প্রেম তাঁর অন্তরঙ্গ। পুরাণের রুদ্র তাণ্ডবে মেতেছিল প্রেমের কারণেই, যেমন সতীর মৃতদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে বিধ্বংসী নৃত্যে শিব এক অনন্য উপমা সৃষ্টি করেছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আড়াইহাজারে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগে এসআইকে ক্লোজড, পুলিশ লাইনে সংযুক্ত

নজরুলের শ্যামাসংগীতে ভক্তির ভিন্ন রূপ: মায়ের অধিক মেয়ে রূপে শ্যামা

আপডেট সময় : ০২:৩০:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

বাঙালি হিন্দুর আরাধ্যা দেবী কালী, যিনি শ্মশানবাসিনী ও রুদ্ররূপা হিসেবে পরিচিত, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের হাত ধরে প্রথম ঘরে উঠেছিলেন। তাঁর সেই উগ্ররূপ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল শুভ্রহাসি ও চন্দ্রকান্তি নিয়ে, ধারণ করেছিল বাৎসল্যরূপ। পরবর্তীতে বাঙালি কবি রামপ্রসাদ ভক্তিনয়ন দিয়ে কালীর দিকে তাকিয়ে তাকে কখনো মা, কখনো শ্যামা, আবার কখনো কন্যারূপে দেখেছেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন রামপ্রসাদের সারস্বত-সাধনার কাব্যসরস্বতী। একই ধারায় পরবর্তীকালের সাধক কমলাকান্তও অসংখ্য শাক্তপদ রচনা করেছেন।

রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের পর, কাজী নজরুল ইসলামই সেই শ্যামাভক্ত কবি, যিনি তাঁর রুদ্রলেখায় ভক্তির গভীর থেকে সংগীতের লিপিমালা তুলে এনেছেন। নজরুল শ্যামাকে ঘরের মেয়ে করে তুলেছেন, অনুরাগে শাসন করেছেন এবং অভিমানে মুখ ফিরিয়েছেন। তাঁর বাৎসল্য তাঁকে এই অধিকার দিয়েছে, যেন শ্যামা তাঁর মায়েরও অধিক মেয়ে। যখন নজরুল গেয়ে ওঠেন, “আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে (মাকে) কে দিয়েছে গালি?/ রাগ ক’রে সে সারা গায়ে মেখেছে তাই কালি।” তখন মনে হয় যেন রাঢ়-বঙ্গের কোনো অবাধ্যবালিকা, পড়শির কটুকথা সইতে না পেরে লজ্জায়-অভিমানে সারা গায়ে কালি মেখে নলখাগড়ার বনে লুকিয়ে আছে।

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল সেই রণরঙ্গিণীর সন্তানই নন, তিনি শ্যামার ব্যথারও দরদী; তাঁর দুঃখরাতের সান্ত্বনা, তাঁর কিশোরীচিত্তের লজ্জা ও মান লুকোনোর আশ্রয়। কালীর সংগীতে এই ধরনের বাৎসল্য পূর্বে কোথাও দেখা যায় না। ব্রজগোপীর হোলি খেলার মধ্যে যেই সখ্য-শৃঙ্গার ধরা পড়ে, বাৎসল্য তার নিকটবর্তী। কাজী নজরুল ইসলাম চিরদিন রুদ্র থেকে বাৎসল্যেই যেতে চেয়েছেন; রুদ্র তাঁর বহিরঙ্গ, প্রেম তাঁর অন্তরঙ্গ। পুরাণের রুদ্র তাণ্ডবে মেতেছিল প্রেমের কারণেই, যেমন সতীর মৃতদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে বিধ্বংসী নৃত্যে শিব এক অনন্য উপমা সৃষ্টি করেছিলেন।