ঢাকা ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণভোটের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে অনড় দলগুলো, চূড়ান্ত সুপারিশ দেবে কমিশন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও গণভোটের সময়সূচি, এর প্রক্রিয়া এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত নিয়ে দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি, জামায়াত সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় এখন তারা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে অনুরোধ করেছে, যেন তারা বিশেষজ্ঞ ও দলগুলোর মতামত সমন্বয় করে গণভোটের সময় ও প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পেশ করে। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন আগামী দুই-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে সরকারকে তাদের চূড়ান্ত পরামর্শ প্রদান করবে।

বুধবার (৮ অক্টোবর) ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরের পর শুরু হওয়া তৃতীয় পর্বের পঞ্চম দিনের এই আলোচনা রাত সাড়ে এগারোটার দিকে শেষ হয়। এর মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সংলাপের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

পাঁচ দিনের রাজনৈতিক সংলাপ শেষে ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, দল এবং জোটগুলোর পক্ষ থেকে কমিশনকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন তারা বিশেষজ্ঞ ও দলীয় মতামত বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ বিষয়ে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেয়। তিনি আরও বলেন, এই পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং গত পাঁচ দিনের সংলাপে উঠে আসা দলগুলোর, বিশেষ করে আজকের (বুধবারের) আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মতামতগুলোকে সমন্বয় করে আগামী দুই-একদিনের মধ্যেই সরকারের কাছে পরামর্শ দেবে। এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল ও জোটকে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবহিত করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ প্যানেল পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছে। এই সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সরকারকে পূর্ণাঙ্গ পরামর্শ পাঠানো হবে।

অধ্যাপক রীয়াজের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতভাবে পাঁচটি বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। এই পরামর্শগুলো হলো— ১) একটি আদেশ জারি করা; ২) ওই আদেশের মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করা; ৩) গণভোটে দুটি আলাদা প্রশ্ন রাখা—একটি ঐকমত্যের বিষয়গুলোর জন্য এবং অন্যটি ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলোর জন্য; ৪) নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠন করা এবং ৫) আদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণভোটে অনুমোদন সাপেক্ষে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। এই পাঁচটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত পাওয়া গেছে।

গণভোটের সময়সহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত তুলে ধরে কমিশনের সহ-সভাপতি বলেন, সারাদিনের আলোচনায় বিভিন্ন দল থেকে নানা মত এসেছে। যেমন, কিছু দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে পৃথক ব্যালটে গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছে। আবার কয়েকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও জানান, কমিশনের মেয়াদ আগামী ১৫ অক্টোবর শেষ হবে এবং এর মধ্যেই তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চায়। ইতোমধ্যে তিন-চতুর্থাংশের বেশি দল এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং আশা করা হচ্ছে বাকি দলগুলোর নামও দ্রুতই পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, অংশগ্রহণকারীদের সহযোগিতায় কমিশন চায় আগামী সাত দিনের মধ্যেই সকল কাজ শেষ করতে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবাই সহযোগিতা করলে ১৫ তারিখের মধ্যেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান করা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক রীয়াজ আরও জানান, কমিশন আগামী ১৮ থেকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়ার সারসংক্ষেপ সহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এই প্রতিবেদনে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সনদ প্রণয়নের ধাপ এবং গণভোট প্রস্তাব পর্যন্ত অগ্রগতির বিস্তারিত বিবরণ থাকবে।

গণভোটের সময়, প্রক্রিয়া, সাংবিধানিক আদেশ নাকি অধ্যাদেশ জারি করে গণভোট হবে এবং নোট অব ডিসেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোটের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আর বেশি সময় বাকি নেই। এর আগে গণভোটের মতো একটি বিশাল আয়োজন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এতে অতিরিক্ত অর্থেরও খরচ হবে।

বিএনপির মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন করা হলে তা মূলত জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার একটি প্রয়াস হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও দাবি করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একই দিনে গণভোট আয়োজন করাই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, আগে আলাদা করে গণভোট আয়োজন করা ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং প্রশাসনিকভাবে জটিল হবে। একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট হলে জনগণ একাধিক ব্যালটে ভোট দিতে পারবে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নতুন কিছু নয়। এতে সময়, অর্থ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সবই কমবে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী চায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদ নিয়ে একটি আলাদা গণভোট হোক। তারা ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে নভেম্বর মাসেই জুলাই সনদের ওপর গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হলে তা জটিলতা সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, অনেকে দুটি নির্বাচন একসঙ্গে করার ভালো দিক বললেও এর মন্দ দিক অনেক বেশি। আপার হাউসের মতো কিছু ইস্যু রয়েছে যা আগামী নির্বাচনের অংশ হবে। যদি একই দিনে গণভোট হয়, তাহলে জনগণ সেগুলো গ্রহণ করবে কি করবে না, তা অনির্ধারিত থেকে যাবে।

তাছাড়া গণভোট ও সংসদ নির্বাচন একই দিনে হলে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে মন্তব্য করে ডা. তাহের বলেন, সবাই একটি ভালো নির্বাচনের আশা করছে। কিন্তু কোনো কারণে যদি সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে গণভোটের জুলাই সনদও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তিনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডাকসু এবং জাকসু নির্বাচনের উদাহরণ তুলে ধরেন।

নির্বাচনী ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য যখন সব প্রস্তুতি নিতেই হবে, তখন গণভোটের জন্য অতিরিক্ত খরচ খুব বড় কিছু নয়, বরং এটি জাতিকে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

নোট অব ডিসেন্ট ইস্যুতে গণভোট নয়, সংসদে মীমাংসা চায় বিএনপি। এ প্রসঙ্গে দলটির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভিন্নমত বা আপত্তি থাকলেও তা জুলাই সনদের অংশ হিসেবেই গণভোটে যাবে এবং ভবিষ্যতে কোনো দল জনগণের ম্যান্ডেট পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এদিকে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে জামায়াত নেতা ডা. তাহের বলেন, মূলত একটি দলই কিছুটা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, তা হলো বিএনপি। তিনি অভিযোগ করেন, তারা একদিকে মানুষকে বলছে সংস্কার মানে, আবার অন্যদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিচ্ছে। তাদের জাতির কাছে পরিষ্কার করে বলা উচিত, তারা সংস্কার মানে কি মানে না।

তিনি আরও বলেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কোনো সিদ্ধান্তের অংশ নয়, বরং এটি ব্যক্তিগত মতামতের রেকর্ড হিসেবে থাকে। একটি দলের নোট অব ডিসেন্ট জাতির ভোটের ম্যান্ডেটের জন্য কোনো আলোচনার বিষয় হতে পারে না।

সাংবিধানিক আদেশ নাকি অধ্যাদেশ জারি করে গণভোট আয়োজিত হবে, এ নিয়েও বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী একমত হতে পারেনি।

এ বিষয়ে জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির প্রস্তাব করেন, জুলাই ঘোষণার ২২, ২৫ ও ২৭ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে পরবর্তীতে গণভোটের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদকে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে।

এ প্রস্তাবের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সাংবিধানিক আদেশ জারি করা সম্ভব নয়। তিনি পরামর্শ দেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ হিসেবে একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে। এরপর একটি অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে, যাতে উল্লেখ থাকবে—সরকার জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য জুলাই সনদে গণভোট আয়োজন করবে।

অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন বলেন, এনসিপি সংবিধান আদেশ বা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মাধ্যমে ১৩তম জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষেই। তিনি বলেন, গণভোটে যদি ইতিবাচক ফল আসে, তাহলে পরবর্তী সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের ক্ষমতা পাবে।

এদিকে, ১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক শহীদুজ্জামান সেলিম অভিযোগ করেন, জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি তুলে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

সংলাপে কমিশনের সদস্যদের মধ্যে বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।

বুধবারের এই সংলাপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি-সহ মোট ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

ঐকমত্য কমিশন তাদের কার্যক্রম শুরু করে ১৫ ফেব্রুয়ারি। ৮ অক্টোবর পর্যন্ত তারা তিন দফায় ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করে এবং জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া প্রস্তুত করে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুদের তাণ্ডব: গুলিতে প্রাণ হারালেন কুতুবদিয়ার এক জেলে

গণভোটের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে অনড় দলগুলো, চূড়ান্ত সুপারিশ দেবে কমিশন

আপডেট সময় : ০৯:৫৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও গণভোটের সময়সূচি, এর প্রক্রিয়া এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত নিয়ে দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি, জামায়াত সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় এখন তারা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে অনুরোধ করেছে, যেন তারা বিশেষজ্ঞ ও দলগুলোর মতামত সমন্বয় করে গণভোটের সময় ও প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পেশ করে। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন আগামী দুই-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে সরকারকে তাদের চূড়ান্ত পরামর্শ প্রদান করবে।

বুধবার (৮ অক্টোবর) ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরের পর শুরু হওয়া তৃতীয় পর্বের পঞ্চম দিনের এই আলোচনা রাত সাড়ে এগারোটার দিকে শেষ হয়। এর মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সংলাপের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

পাঁচ দিনের রাজনৈতিক সংলাপ শেষে ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, দল এবং জোটগুলোর পক্ষ থেকে কমিশনকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন তারা বিশেষজ্ঞ ও দলীয় মতামত বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ বিষয়ে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেয়। তিনি আরও বলেন, এই পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং গত পাঁচ দিনের সংলাপে উঠে আসা দলগুলোর, বিশেষ করে আজকের (বুধবারের) আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মতামতগুলোকে সমন্বয় করে আগামী দুই-একদিনের মধ্যেই সরকারের কাছে পরামর্শ দেবে। এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল ও জোটকে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবহিত করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ প্যানেল পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছে। এই সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সরকারকে পূর্ণাঙ্গ পরামর্শ পাঠানো হবে।

অধ্যাপক রীয়াজের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতভাবে পাঁচটি বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। এই পরামর্শগুলো হলো— ১) একটি আদেশ জারি করা; ২) ওই আদেশের মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করা; ৩) গণভোটে দুটি আলাদা প্রশ্ন রাখা—একটি ঐকমত্যের বিষয়গুলোর জন্য এবং অন্যটি ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলোর জন্য; ৪) নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠন করা এবং ৫) আদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণভোটে অনুমোদন সাপেক্ষে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। এই পাঁচটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত পাওয়া গেছে।

গণভোটের সময়সহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত তুলে ধরে কমিশনের সহ-সভাপতি বলেন, সারাদিনের আলোচনায় বিভিন্ন দল থেকে নানা মত এসেছে। যেমন, কিছু দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে পৃথক ব্যালটে গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছে। আবার কয়েকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও জানান, কমিশনের মেয়াদ আগামী ১৫ অক্টোবর শেষ হবে এবং এর মধ্যেই তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চায়। ইতোমধ্যে তিন-চতুর্থাংশের বেশি দল এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং আশা করা হচ্ছে বাকি দলগুলোর নামও দ্রুতই পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, অংশগ্রহণকারীদের সহযোগিতায় কমিশন চায় আগামী সাত দিনের মধ্যেই সকল কাজ শেষ করতে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবাই সহযোগিতা করলে ১৫ তারিখের মধ্যেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান করা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক রীয়াজ আরও জানান, কমিশন আগামী ১৮ থেকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়ার সারসংক্ষেপ সহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এই প্রতিবেদনে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সনদ প্রণয়নের ধাপ এবং গণভোট প্রস্তাব পর্যন্ত অগ্রগতির বিস্তারিত বিবরণ থাকবে।

গণভোটের সময়, প্রক্রিয়া, সাংবিধানিক আদেশ নাকি অধ্যাদেশ জারি করে গণভোট হবে এবং নোট অব ডিসেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোটের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আর বেশি সময় বাকি নেই। এর আগে গণভোটের মতো একটি বিশাল আয়োজন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এতে অতিরিক্ত অর্থেরও খরচ হবে।

বিএনপির মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন করা হলে তা মূলত জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার একটি প্রয়াস হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও দাবি করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একই দিনে গণভোট আয়োজন করাই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, আগে আলাদা করে গণভোট আয়োজন করা ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং প্রশাসনিকভাবে জটিল হবে। একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট হলে জনগণ একাধিক ব্যালটে ভোট দিতে পারবে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নতুন কিছু নয়। এতে সময়, অর্থ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সবই কমবে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী চায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদ নিয়ে একটি আলাদা গণভোট হোক। তারা ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে নভেম্বর মাসেই জুলাই সনদের ওপর গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হলে তা জটিলতা সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, অনেকে দুটি নির্বাচন একসঙ্গে করার ভালো দিক বললেও এর মন্দ দিক অনেক বেশি। আপার হাউসের মতো কিছু ইস্যু রয়েছে যা আগামী নির্বাচনের অংশ হবে। যদি একই দিনে গণভোট হয়, তাহলে জনগণ সেগুলো গ্রহণ করবে কি করবে না, তা অনির্ধারিত থেকে যাবে।

তাছাড়া গণভোট ও সংসদ নির্বাচন একই দিনে হলে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে মন্তব্য করে ডা. তাহের বলেন, সবাই একটি ভালো নির্বাচনের আশা করছে। কিন্তু কোনো কারণে যদি সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে গণভোটের জুলাই সনদও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তিনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডাকসু এবং জাকসু নির্বাচনের উদাহরণ তুলে ধরেন।

নির্বাচনী ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য যখন সব প্রস্তুতি নিতেই হবে, তখন গণভোটের জন্য অতিরিক্ত খরচ খুব বড় কিছু নয়, বরং এটি জাতিকে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

নোট অব ডিসেন্ট ইস্যুতে গণভোট নয়, সংসদে মীমাংসা চায় বিএনপি। এ প্রসঙ্গে দলটির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভিন্নমত বা আপত্তি থাকলেও তা জুলাই সনদের অংশ হিসেবেই গণভোটে যাবে এবং ভবিষ্যতে কোনো দল জনগণের ম্যান্ডেট পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এদিকে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে জামায়াত নেতা ডা. তাহের বলেন, মূলত একটি দলই কিছুটা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, তা হলো বিএনপি। তিনি অভিযোগ করেন, তারা একদিকে মানুষকে বলছে সংস্কার মানে, আবার অন্যদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিচ্ছে। তাদের জাতির কাছে পরিষ্কার করে বলা উচিত, তারা সংস্কার মানে কি মানে না।

তিনি আরও বলেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কোনো সিদ্ধান্তের অংশ নয়, বরং এটি ব্যক্তিগত মতামতের রেকর্ড হিসেবে থাকে। একটি দলের নোট অব ডিসেন্ট জাতির ভোটের ম্যান্ডেটের জন্য কোনো আলোচনার বিষয় হতে পারে না।

সাংবিধানিক আদেশ নাকি অধ্যাদেশ জারি করে গণভোট আয়োজিত হবে, এ নিয়েও বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী একমত হতে পারেনি।

এ বিষয়ে জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির প্রস্তাব করেন, জুলাই ঘোষণার ২২, ২৫ ও ২৭ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে পরবর্তীতে গণভোটের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদকে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে।

এ প্রস্তাবের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সাংবিধানিক আদেশ জারি করা সম্ভব নয়। তিনি পরামর্শ দেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ হিসেবে একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে। এরপর একটি অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে, যাতে উল্লেখ থাকবে—সরকার জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য জুলাই সনদে গণভোট আয়োজন করবে।

অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন বলেন, এনসিপি সংবিধান আদেশ বা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মাধ্যমে ১৩তম জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষেই। তিনি বলেন, গণভোটে যদি ইতিবাচক ফল আসে, তাহলে পরবর্তী সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের ক্ষমতা পাবে।

এদিকে, ১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক শহীদুজ্জামান সেলিম অভিযোগ করেন, জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি তুলে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

সংলাপে কমিশনের সদস্যদের মধ্যে বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।

বুধবারের এই সংলাপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি-সহ মোট ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

ঐকমত্য কমিশন তাদের কার্যক্রম শুরু করে ১৫ ফেব্রুয়ারি। ৮ অক্টোবর পর্যন্ত তারা তিন দফায় ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করে এবং জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া প্রস্তুত করে।