ঢাকা ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৩ হাজার, বেশি স্কুল-অফিসের সময়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:২৩:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

সারা দেশে গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ হাজার ২৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫০ হাজার ৮৮৭ জন আহত হয়েছেন। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নিহতদের মধ্যে ৩৫ শতাংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এবং ২৩ শতাংশ রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে মারা গেছেন। উদ্বেগজনকভাবে, নিহতদের ৪২ শতাংশের বেশি নারী, শিশু ও শিক্ষার্থী।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এই পাঁচ বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে, যা নিচে তুলে ধরা হলো:

বছর দুর্ঘটনার সংখ্যা নিহত আহত
২০২০ ৪,৬৩৫ ৫,৪৩১ ৭,৩৭৯
২০২১ ৫,২৭১ ৬,২৮৪ ৭,৪৬৮
২০২২ ৬,৮২৯ ৭,৭২৩ ১২,৬১৫
২০২৩ ৭,০১৩ ৬,৫২৪ ১১,৪০৭
২০২৪ ৭,০২৭ ৭,২৯৪ ১২,০১৮

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। মোট মৃত্যুর ৩৫.৬৭ শতাংশ বা ১১ হাজার ৮৬৪ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পথচারীরা, যা মোট মৃত্যুর ২৩.০৩ শতাংশ (৭ হাজার ৬৫৯ জন)। এছাড়া থ্রি-হুইলারচালক ও যাত্রী নিহত হয়েছেন ১৭ শতাংশ। অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের যাত্রী ৬.৭২ শতাংশ এবং বাসযাত্রী ৫.১৭ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরে মোট ৩৩ হাজার ২৫৬ জন নিহতের মধ্যে নারী, শিশু ও শিক্ষার্থী রয়েছেন ১৪ হাজার ২১৬ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪২.৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে শিশু নিহত হয়েছে ৪ হাজার ৮০৬ জন (১৪.৪৫%), নারী ৪ হাজার ৭২৬ জন (১৪.২১%) এবং শিক্ষার্থী ৪ হাজার ৬৮৪ জন (১৪.০৮%)। শিশুদের বেশিরভাগ দুর্ঘটনা স্কুলে যাওয়া বা খেলার সময় ঘটে। নারী ও শিক্ষার্থীরা মূলত পথচারী বা যাত্রী হিসেবেই প্রাণ হারিয়েছেন।

পাঁচ বছরে সড়ক পারাপারে বা ফুটপাতে মোট ৭ হাজার ৬৫৯ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৪.৪৭ শতাংশ রাস্তা পার হওয়ার সময় এবং ৪৫.৫২ শতাংশ রাস্তায় হাঁটার সময় মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি পথচারী মারা গেছেন আঞ্চলিক সড়কে (৩৪.৪৫%)।

পাঁচ বছরে মোট ১১ হাজার ৭২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১ হাজার ৮৬৪ জন মারা গেছেন। এর কারণ হিসেবে কিশোর চালকদের বেপরোয়া আচরণ, অদক্ষ ও অসুস্থ ড্রাইভিং, এবং ট্রাক ও বাসের সঙ্গে সংঘর্ষকে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৯.০৪ শতাংশ ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সংঘর্ষের কারণে। পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৫.৩৩ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আঞ্চলিক সড়কেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৩৭.০৫ শতাংশ। এরপরে জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৫.২৫ শতাংশ।

সকালে (অফিস বা স্কুলের ব্যস্ত সময়) সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যা মোট দুর্ঘটনার ২৯.৪১ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরে ৪৬৭ জন গার্মেন্টস শ্রমিক এবং ৫ হাজার ৫৫ জন পরিবহন শ্রমিক ও ড্রাইভার সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি: ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৭৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে শুধু পুলিশ সদস্যই ২৬৬ জন।

গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে ১ হাজার ২২৮টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে ৪২.৩ শতাংশ পথচারী এবং ৩৮.৬ শতাংশ মোটরসাইকেলচালক। শহরে রাত ও ভোরে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এখনও সমন্বিত সড়ক পরিবহন কৌশল গড়ে ওঠেনি। পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় বিশৃঙ্খলা ও জবাবদিহির অভাব তৈরি হচ্ছে। তিনি আইনের শাসনের ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারকদের গণপরিবহন ব্যবহার না করার মানসিকতার সমালোচনা করে দ্রুত টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়নের দাবি জানান।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারিগরি ব্যর্থতা (টেকনিক্যাল ফেইলুর) জড়িত থাকে। তিনি আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে রাস্তা নির্মাণ, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৌশলভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করার ওপর জোর দেন।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইস এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ ট্রাফিক আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি—এই দুই ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত কর্মসূচি পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এক মাসেই ৯ বার কাঁপল বাংলাদেশ: ঘন ঘন ভূমিকম্পে বাড়ছে উদ্বেগ, প্রস্তুতিতে জোরের তাগিদ

পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৩ হাজার, বেশি স্কুল-অফিসের সময়

আপডেট সময় : ১০:২৩:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫

সারা দেশে গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ হাজার ২৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫০ হাজার ৮৮৭ জন আহত হয়েছেন। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নিহতদের মধ্যে ৩৫ শতাংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এবং ২৩ শতাংশ রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে মারা গেছেন। উদ্বেগজনকভাবে, নিহতদের ৪২ শতাংশের বেশি নারী, শিশু ও শিক্ষার্থী।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এই পাঁচ বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে, যা নিচে তুলে ধরা হলো:

বছর দুর্ঘটনার সংখ্যা নিহত আহত
২০২০ ৪,৬৩৫ ৫,৪৩১ ৭,৩৭৯
২০২১ ৫,২৭১ ৬,২৮৪ ৭,৪৬৮
২০২২ ৬,৮২৯ ৭,৭২৩ ১২,৬১৫
২০২৩ ৭,০১৩ ৬,৫২৪ ১১,৪০৭
২০২৪ ৭,০২৭ ৭,২৯৪ ১২,০১৮

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। মোট মৃত্যুর ৩৫.৬৭ শতাংশ বা ১১ হাজার ৮৬৪ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পথচারীরা, যা মোট মৃত্যুর ২৩.০৩ শতাংশ (৭ হাজার ৬৫৯ জন)। এছাড়া থ্রি-হুইলারচালক ও যাত্রী নিহত হয়েছেন ১৭ শতাংশ। অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের যাত্রী ৬.৭২ শতাংশ এবং বাসযাত্রী ৫.১৭ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরে মোট ৩৩ হাজার ২৫৬ জন নিহতের মধ্যে নারী, শিশু ও শিক্ষার্থী রয়েছেন ১৪ হাজার ২১৬ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪২.৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে শিশু নিহত হয়েছে ৪ হাজার ৮০৬ জন (১৪.৪৫%), নারী ৪ হাজার ৭২৬ জন (১৪.২১%) এবং শিক্ষার্থী ৪ হাজার ৬৮৪ জন (১৪.০৮%)। শিশুদের বেশিরভাগ দুর্ঘটনা স্কুলে যাওয়া বা খেলার সময় ঘটে। নারী ও শিক্ষার্থীরা মূলত পথচারী বা যাত্রী হিসেবেই প্রাণ হারিয়েছেন।

পাঁচ বছরে সড়ক পারাপারে বা ফুটপাতে মোট ৭ হাজার ৬৫৯ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৪.৪৭ শতাংশ রাস্তা পার হওয়ার সময় এবং ৪৫.৫২ শতাংশ রাস্তায় হাঁটার সময় মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি পথচারী মারা গেছেন আঞ্চলিক সড়কে (৩৪.৪৫%)।

পাঁচ বছরে মোট ১১ হাজার ৭২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১ হাজার ৮৬৪ জন মারা গেছেন। এর কারণ হিসেবে কিশোর চালকদের বেপরোয়া আচরণ, অদক্ষ ও অসুস্থ ড্রাইভিং, এবং ট্রাক ও বাসের সঙ্গে সংঘর্ষকে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৯.০৪ শতাংশ ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সংঘর্ষের কারণে। পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৫.৩৩ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আঞ্চলিক সড়কেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৩৭.০৫ শতাংশ। এরপরে জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৫.২৫ শতাংশ।

সকালে (অফিস বা স্কুলের ব্যস্ত সময়) সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যা মোট দুর্ঘটনার ২৯.৪১ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরে ৪৬৭ জন গার্মেন্টস শ্রমিক এবং ৫ হাজার ৫৫ জন পরিবহন শ্রমিক ও ড্রাইভার সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি: ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৭৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে শুধু পুলিশ সদস্যই ২৬৬ জন।

গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে ১ হাজার ২২৮টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে ৪২.৩ শতাংশ পথচারী এবং ৩৮.৬ শতাংশ মোটরসাইকেলচালক। শহরে রাত ও ভোরে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এখনও সমন্বিত সড়ক পরিবহন কৌশল গড়ে ওঠেনি। পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় বিশৃঙ্খলা ও জবাবদিহির অভাব তৈরি হচ্ছে। তিনি আইনের শাসনের ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারকদের গণপরিবহন ব্যবহার না করার মানসিকতার সমালোচনা করে দ্রুত টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়নের দাবি জানান।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারিগরি ব্যর্থতা (টেকনিক্যাল ফেইলুর) জড়িত থাকে। তিনি আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে রাস্তা নির্মাণ, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৌশলভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করার ওপর জোর দেন।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইস এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ ট্রাফিক আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি—এই দুই ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত কর্মসূচি পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।