ঢাকা ০৫:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পুলিশ সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়ন: কচ্ছপগতি, অনেক প্রস্তাবই নাকচ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৪:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩১ বার পড়া হয়েছে

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জনবান্ধব পুলিশিং, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে যে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, তার সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন চলছে কচ্ছপগতিতে। প্রযুক্তি সংযোজন, নতুন আইন প্রণয়ন এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের কারণে ঝুলে আছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এসব সুপারিশের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা হয়।

পৃথক হেল্পলাইন ও ভাসমান থানা: প্রস্তাব বাতিল, জোর ৯৯৯-এ
কমিশনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকারের জন্য পৃথক হেল্পলাইন অথবা তল্লাশির সময় পুলিশের পরিচয় বা ওয়ারেন্ট নিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা বিধানে জরুরি কল সার্ভিস চালুর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে পুলিশ অধিদপ্তর। এর পরিবর্তে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, বর্তমান জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-কে আরও অধিকতর শক্তিশালী করা হবে। ৯৯৯-এর সক্ষমতা ১০০টি ওয়ার্ক স্টেশন থেকে ৫০০টিতে উন্নীত করার জন্য ৫৫২ কোটি টাকার একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পাঠানো হয়েছে। একইভাবে, নৌ-নেটওয়ার্কভুক্ত জলপথে দস্যুতা দমনের লক্ষ্যে ‘ভাসমান থানা’ গঠনের সুপারিশও বাতিল করা হয়। এর বদলে বিদ্যমান নৌ-পুলিশ ফাঁড়িগুলোকেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নৌযান সরবরাহ করে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পুরোনো আইনের সংস্কার এবং জবাবদিহিতার উদ্যোগ
সংস্কার কমিশনের একটি অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ব্রিটিশ আমলের পুরোনো আইন—যেমন পুলিশ আইন ১৮৬১, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং পিআরবি ১৯৪৩—সংস্কার করে যুগোপযোগী করা। আইনগুলোর আন্তঃসম্পর্ক ও জটিলতার কারণে এর পরিবর্তন সহজসাধ্য নয়, তবে তা হালনাগাদের বিষয়ে সবাই একমত এবং ইতোমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)-এর অতীত কার্যক্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর নেতৃত্বে একটি সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যদিও সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি বর্তমানে অন্য একটি আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ
পুলিশের আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে মিশ্র ফল দেখা গেছে। আটক বা রিমান্ডে নেওয়া আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রতিটি থানায় স্বচ্ছ কাচের ঘেরাটোপ দেওয়া আলাদা জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুপারিশ করা হলেও, সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে এটি কেবল নির্মীয়মাণ ও নতুন থানাসমূহে স্থাপন করা হবে। পুরোনো থানাগুলোতে এটিকে আশু বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মত দেওয়া হয়। তবে, অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সুপারিশের পাইলটিং শুরু হয়েছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশে। সারা দেশে এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪০ হাজার ডিভাইসের প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন। ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে ছয়টি বিভাগীয় শহরে ‘সায়েন্টিফিক ইন্টিগ্রেশন সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, নারী আসামিকে নারী পুলিশের উপস্থিতিতে শালীনতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করার সক্ষমতা বাড়াতে ৫০০ জন নারী এএসআই নিয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়া গেছে।

তবে, এফআইআর বহির্ভূত আসামি গ্রেপ্তারে আদালতের আদেশের জন্য অপেক্ষা করার সুপারিশটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ মহাপরিদর্শক নাকচ করে দিয়েছেন। তারা জানান, এতে অপরাধীর পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, তাই প্রচলিত পদ্ধতিই অধিক কার্যকর।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ: ‘পুরুষতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার অভাব’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, কমিশনের সুপারিশগুলো নিরাপত্তা কাঠামোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারত। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে এটি ‘পরীক্ষামূলক পর্যায়ে’ সীমাবদ্ধ রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দীন এই ধীরগতির সমালোচনা করে বলেন, মানবাধিকার রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো—যেমন স্বচ্ছ কাচের জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ বা আলাদা হেল্পলাইন—হয় বাতিল হয়েছে, নয়তো অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশে মানবাধিকার সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো ‘প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার অভাব’। তিনি বলেন, সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক পুলিশ গঠন করা, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সংস্কারের মাপকাঠি ‘মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা’ না হবে, ততক্ষণ এই উদ্যোগ আরেকটি প্রশাসনিক চক্রেই হারিয়ে যাবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষকদের অন্য পেশায় যুক্ত হতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি আবশ্যক: শিক্ষামন্ত্রী

পুলিশ সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়ন: কচ্ছপগতি, অনেক প্রস্তাবই নাকচ

আপডেট সময় : ১০:০৪:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জনবান্ধব পুলিশিং, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে যে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, তার সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন চলছে কচ্ছপগতিতে। প্রযুক্তি সংযোজন, নতুন আইন প্রণয়ন এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের কারণে ঝুলে আছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এসব সুপারিশের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা হয়।

পৃথক হেল্পলাইন ও ভাসমান থানা: প্রস্তাব বাতিল, জোর ৯৯৯-এ
কমিশনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকারের জন্য পৃথক হেল্পলাইন অথবা তল্লাশির সময় পুলিশের পরিচয় বা ওয়ারেন্ট নিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা বিধানে জরুরি কল সার্ভিস চালুর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে পুলিশ অধিদপ্তর। এর পরিবর্তে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, বর্তমান জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-কে আরও অধিকতর শক্তিশালী করা হবে। ৯৯৯-এর সক্ষমতা ১০০টি ওয়ার্ক স্টেশন থেকে ৫০০টিতে উন্নীত করার জন্য ৫৫২ কোটি টাকার একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পাঠানো হয়েছে। একইভাবে, নৌ-নেটওয়ার্কভুক্ত জলপথে দস্যুতা দমনের লক্ষ্যে ‘ভাসমান থানা’ গঠনের সুপারিশও বাতিল করা হয়। এর বদলে বিদ্যমান নৌ-পুলিশ ফাঁড়িগুলোকেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নৌযান সরবরাহ করে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পুরোনো আইনের সংস্কার এবং জবাবদিহিতার উদ্যোগ
সংস্কার কমিশনের একটি অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ব্রিটিশ আমলের পুরোনো আইন—যেমন পুলিশ আইন ১৮৬১, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং পিআরবি ১৯৪৩—সংস্কার করে যুগোপযোগী করা। আইনগুলোর আন্তঃসম্পর্ক ও জটিলতার কারণে এর পরিবর্তন সহজসাধ্য নয়, তবে তা হালনাগাদের বিষয়ে সবাই একমত এবং ইতোমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)-এর অতীত কার্যক্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর নেতৃত্বে একটি সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যদিও সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি বর্তমানে অন্য একটি আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ
পুলিশের আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে মিশ্র ফল দেখা গেছে। আটক বা রিমান্ডে নেওয়া আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রতিটি থানায় স্বচ্ছ কাচের ঘেরাটোপ দেওয়া আলাদা জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুপারিশ করা হলেও, সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে এটি কেবল নির্মীয়মাণ ও নতুন থানাসমূহে স্থাপন করা হবে। পুরোনো থানাগুলোতে এটিকে আশু বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মত দেওয়া হয়। তবে, অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সুপারিশের পাইলটিং শুরু হয়েছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশে। সারা দেশে এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪০ হাজার ডিভাইসের প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন। ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে ছয়টি বিভাগীয় শহরে ‘সায়েন্টিফিক ইন্টিগ্রেশন সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, নারী আসামিকে নারী পুলিশের উপস্থিতিতে শালীনতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করার সক্ষমতা বাড়াতে ৫০০ জন নারী এএসআই নিয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়া গেছে।

তবে, এফআইআর বহির্ভূত আসামি গ্রেপ্তারে আদালতের আদেশের জন্য অপেক্ষা করার সুপারিশটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ মহাপরিদর্শক নাকচ করে দিয়েছেন। তারা জানান, এতে অপরাধীর পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, তাই প্রচলিত পদ্ধতিই অধিক কার্যকর।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ: ‘পুরুষতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার অভাব’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, কমিশনের সুপারিশগুলো নিরাপত্তা কাঠামোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারত। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে এটি ‘পরীক্ষামূলক পর্যায়ে’ সীমাবদ্ধ রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দীন এই ধীরগতির সমালোচনা করে বলেন, মানবাধিকার রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো—যেমন স্বচ্ছ কাচের জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ বা আলাদা হেল্পলাইন—হয় বাতিল হয়েছে, নয়তো অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশে মানবাধিকার সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো ‘প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার অভাব’। তিনি বলেন, সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক পুলিশ গঠন করা, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সংস্কারের মাপকাঠি ‘মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা’ না হবে, ততক্ষণ এই উদ্যোগ আরেকটি প্রশাসনিক চক্রেই হারিয়ে যাবে।