ঢাকা ১১:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প অকার্যকর: হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে হাহাকার উত্তরের কৃষকের

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে একসময়ের আশার আলো ছিল নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল অবকাঠামো, যেখানে রয়েছে বিস্তৃত ক্যানেল, অত্যাধুনিক স্লুইসগেট ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, আজ পানিশূন্যতায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মূল উৎস তিস্তা নদীতে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের অভাবে এই প্রকল্প তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা উত্তরের কৃষকদের জীবনযাত্রায় গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, একসময়ের খরস্রোতা তিস্তা নদী এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে যেখানে নদীর পানিপ্রবাহ গড়ে দুই লাখ কিউসেক ছাড়িয়ে যেত, শুষ্ক মৌসুমে তা মাত্র দুই হাজার কিউসেকে নেমে আসে। অনেক সময় ডালিয়া পয়েন্টে এই প্রবাহ ৫০০ কিউসেকেরও নিচে চলে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ কর্তৃক বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের কারণেই বাংলাদেশের অংশে তিস্তা নদী মারাত্মক পানি সংকটে পড়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা ক্যানেল নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের ১২টি উপজেলায় বিস্তৃত। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই ক্যানেলগুলোর সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজ ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার দাবি করলেও, বাস্তবে এই ক্যানেলগুলোতে এখনো তিস্তার পানি পৌঁছায়নি। অনেক ক্যানেল এখন বালুচরে পরিণত হয়েছে, যা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।

এ অবস্থার শিকার হচ্ছেন উত্তরের কৃষকরা। নীলফামারী সদরের কৃষক রহিম উদ্দিন জানান, “ক্যানেল আছে, কিন্তু পানি নেই। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিনে দ্বিগুণ খরচে জমিতে পানি দিতে হচ্ছে।” মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পভুক্ত এলাকার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কৃষক বর্তমানে বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নদীর পানি না পাওয়ায় শ্যালো মেশিন ও ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে গিয়ে বিঘাপ্রতি সেচ খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। অথচ, নদীর পানি পেলে এই খরচ মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় সীমাবদ্ধ থাকত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নগর দারোয়ানী এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “সার আর তেলের দাম বেশি, তার ওপর পানির জন্যও বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে কৃষক বাঁচবে কীভাবে?”

১৯৯০ সালে যাত্রা শুরুর সময় তিস্তা সেচ প্রকল্পের সেচ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমি। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে সেচ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৭ হাজার হেক্টর। তবে বর্তমান পানিপ্রবাহের বাস্তবতায় এই লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক অর্জনও অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞ ও নদী আন্দোলনকারীরা বলছেন, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা ক্যানেল সম্প্রসারণ দিয়ে তিস্তা সেচ প্রকল্প কার্যকর করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের পানি ধরে রাখতে রিজার্ভার বা জলাধার নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায়, হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর উত্তরের কৃষক বঞ্চিতই থাকবেন তাদের প্রাপ্য সেচ সুবিধা থেকে। এ সেচ প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের তথ্যেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।

এ ব্যাপারে নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমানের দাবি, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ১০ হাজার কিউসেক পানি রয়েছে। তবে, ব্যারাজ এলাকা ডালিয়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, ব্যারাজের উজানে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ব্যারাজের ভাটিতে ১১০ কিলোমিটার এলাকায় মাত্র ২০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না, যা প্রকল্পের অকার্যকর অবস্থার চিত্র স্পষ্ট করে তোলে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রতি শান্তি আলোচনার প্রস্তাব

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প অকার্যকর: হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে হাহাকার উত্তরের কৃষকের

আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে একসময়ের আশার আলো ছিল নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল অবকাঠামো, যেখানে রয়েছে বিস্তৃত ক্যানেল, অত্যাধুনিক স্লুইসগেট ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, আজ পানিশূন্যতায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মূল উৎস তিস্তা নদীতে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের অভাবে এই প্রকল্প তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা উত্তরের কৃষকদের জীবনযাত্রায় গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, একসময়ের খরস্রোতা তিস্তা নদী এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে যেখানে নদীর পানিপ্রবাহ গড়ে দুই লাখ কিউসেক ছাড়িয়ে যেত, শুষ্ক মৌসুমে তা মাত্র দুই হাজার কিউসেকে নেমে আসে। অনেক সময় ডালিয়া পয়েন্টে এই প্রবাহ ৫০০ কিউসেকেরও নিচে চলে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ কর্তৃক বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের কারণেই বাংলাদেশের অংশে তিস্তা নদী মারাত্মক পানি সংকটে পড়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা ক্যানেল নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের ১২টি উপজেলায় বিস্তৃত। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই ক্যানেলগুলোর সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজ ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার দাবি করলেও, বাস্তবে এই ক্যানেলগুলোতে এখনো তিস্তার পানি পৌঁছায়নি। অনেক ক্যানেল এখন বালুচরে পরিণত হয়েছে, যা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।

এ অবস্থার শিকার হচ্ছেন উত্তরের কৃষকরা। নীলফামারী সদরের কৃষক রহিম উদ্দিন জানান, “ক্যানেল আছে, কিন্তু পানি নেই। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিনে দ্বিগুণ খরচে জমিতে পানি দিতে হচ্ছে।” মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পভুক্ত এলাকার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কৃষক বর্তমানে বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নদীর পানি না পাওয়ায় শ্যালো মেশিন ও ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে গিয়ে বিঘাপ্রতি সেচ খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। অথচ, নদীর পানি পেলে এই খরচ মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় সীমাবদ্ধ থাকত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নগর দারোয়ানী এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “সার আর তেলের দাম বেশি, তার ওপর পানির জন্যও বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে কৃষক বাঁচবে কীভাবে?”

১৯৯০ সালে যাত্রা শুরুর সময় তিস্তা সেচ প্রকল্পের সেচ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমি। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে সেচ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৭ হাজার হেক্টর। তবে বর্তমান পানিপ্রবাহের বাস্তবতায় এই লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক অর্জনও অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞ ও নদী আন্দোলনকারীরা বলছেন, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা ক্যানেল সম্প্রসারণ দিয়ে তিস্তা সেচ প্রকল্প কার্যকর করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের পানি ধরে রাখতে রিজার্ভার বা জলাধার নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায়, হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর উত্তরের কৃষক বঞ্চিতই থাকবেন তাদের প্রাপ্য সেচ সুবিধা থেকে। এ সেচ প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের তথ্যেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।

এ ব্যাপারে নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমানের দাবি, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ১০ হাজার কিউসেক পানি রয়েছে। তবে, ব্যারাজ এলাকা ডালিয়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, ব্যারাজের উজানে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ব্যারাজের ভাটিতে ১১০ কিলোমিটার এলাকায় মাত্র ২০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না, যা প্রকল্পের অকার্যকর অবস্থার চিত্র স্পষ্ট করে তোলে।