বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মানচিত্রে গত এক দশকে চীনের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ অত্যন্ত দৃশ্যমান রূপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, রেলপথ, বন্দর এবং শিল্পাঞ্চলসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে চীন এখন দেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চীন ও হংকং থেকে আসা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) স্টক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। দেশে বর্তমানে ১,০০০টিরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান কর্মরত রয়েছে, যা প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর শেষে ১৮ ঘণ্টার চীন সফর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে নতুন গতি এনেছে। এই সফরে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ অবকাঠামো চুক্তি, চট্টগ্রাম ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং টাটকা কাঁঠাল রফতানির ফাইটোস্যানিটারি প্রোটোকলসহ ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রাম আনোয়ারা কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে ৭৭৬ একর জমিতে ‘চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড) গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও ৩৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের কৃষি ও নদী ব্যবস্থাপনায় বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ এবং রাজবাড়ীর পাংশায় অনুমোদন পাওয়া ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়নেও চীনের সহায়তার কথা আলোচিত হচ্ছে।
তবে এই বিশাল উন্নয়ন যাত্রার বিপরীতে চড়া সুদের বাণিজ্যিক ঋণ, অনিয়ন্ত্রিত ইপিসি (EPC) চুক্তি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের অভাব নিয়ে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা কড়া সতর্কতা জারি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আনা বিনিয়োগ অর্থনীতির গতি ঘোরাতে পারে। কিন্তু চীনা ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার সাধারণত চড়া থাকে এবং ঋণদাতা দেশের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পায়। তাই চড়া সুদের ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই বিকল্প উৎসের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে জ্বালানি খাতে চীনা বিনিয়োগ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি ও বাণিজ্যিক ঋণের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন খরচ সরকারের আয়ের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি করেছে। এর ফলে রানিং বিল ও ঋণের কিস্তি মেটাতে সরকারকে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসব ক্ষতিকর চুক্তি অনতিবিলম্বে পুনর্মূল্যায়ন না করলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়তে পারে।
রিপোর্টারের নাম 
























