ঢাকা ০৫:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অসহায় সরকার

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:০০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৭ বার পড়া হয়েছে

নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার বিভিন্ন সময়ে আমদানির ঘোষণা দিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করলেও, বাস্তবে ভোক্তা তার সুবিধা পাচ্ছেন না; বরং বাজার সিন্ডিকেটেরই লাভ হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করলেও আড়ালে সেই পুরোনো সিন্ডিকেটের কাছেই অসহায়।

পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি ও আমদানির অনুমতি

সম্প্রতি কোনো কারণ ছাড়াই পেঁয়াজের দাম এক লাফে কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা বেড়ে খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। সরকার পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দেওয়ার পর চট্টগ্রামে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা দাম কমার খবর এলেও রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলে দাম সামান্যই কমেছে।

বাজার তদারকি তথ্য অনুযায়ী, আড়তদার সিন্ডিকেট সেপ্টেম্বর থেকেই পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি শুরু করে। সর্বশেষ গত দুই দিনে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে তারা বাজার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে নেয় এবং ভরা মৌসুমে আমদানি অনুমতির জন্য সরকারকে চাপ দেয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) উভয়ই দেশে পেঁয়াজের সংকট নেই বলে নিশ্চিত করলেও, অদৃশ্য শক্তির কাছে নত হয়ে শনিবার রাতে বাজার সহনীয় রাখতে সীমিত আকারে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০টি করে আইপি (আমদানি অনুমতি) ইস্যু করা হবে, যেখানে প্রতিটি আইপিতে সর্বোচ্চ ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন থাকবে।

চার দিন আগে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১১০ টাকা, যা অক্টোবরে ছিল ৭০ টাকা। আমদানির ঘোষণার পরও সোমবার (৮ নভেম্বর) প্রতিকেজি পেঁয়াজ ১৪০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়, যা দুই দিন আগে ১৪০-১৬০ টাকা ছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই এবং আমদানির অনুমতি দিতে সরকারকে বাধ্য করতেই সিন্ডিকেটচক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে।

ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেটের সুবিধা

ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন দুবার অনুমতি চেয়েও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাড়া না পাওয়ায় একরকম অনুমতি ছাড়াই প্রতিলিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।

কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে এবং শেষ পর্যন্ত রোববার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করে লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর বৈধতা দেয়। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে ৯ টাকা বাড়ালেও সরকার কিছু কমিয়ে ৬ টাকার বৈধতা দিয়ে প্রকারান্তরে সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা করেছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার কথা না থাকলেও সরকার লিটারে ৬ টাকা বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করেছে এবং ভোক্তার পকেট কেটেছে।

অতীতের কারসাজির চিত্র

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরগুলোতেও অসাধু চক্র একই ধরনের কারসাজি করেছে:

পণ্য২০২৩ সালের শুরুতে দামকারসাজির সর্বোচ্চ দামসরকারের নির্ধারিত দামবাজারে বিক্রয়মূল্য
আলু২০ টাকা/কেজি৪৫-৫০ টাকা/কেজি (জুন)৩৫-৩৬ টাকা/কেজি৪৫-৫০ টাকা/কেজি
পেঁয়াজ৩০ টাকা/কেজি (মার্চ)৯০ টাকা/কেজি (মে)৬৪-৬৫ টাকা/কেজি৮০-৮৫ টাকা/কেজি
ডিম১০ টাকা/পিস (জানুয়ারি)১৪ টাকা/পিস (সেপ্টেম্বর)১২ টাকা/পিস১৩ টাকা/পিস

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এমকে মুজেরী বলেন, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আগে থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি অনিয়ম করলে শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার সুরক্ষা দিতে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অভয়নগরে জামায়াত কর্মীকে কুপিয়ে জখম, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অসহায় সরকার

আপডেট সময় : ০৩:০০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার বিভিন্ন সময়ে আমদানির ঘোষণা দিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করলেও, বাস্তবে ভোক্তা তার সুবিধা পাচ্ছেন না; বরং বাজার সিন্ডিকেটেরই লাভ হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করলেও আড়ালে সেই পুরোনো সিন্ডিকেটের কাছেই অসহায়।

পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি ও আমদানির অনুমতি

সম্প্রতি কোনো কারণ ছাড়াই পেঁয়াজের দাম এক লাফে কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা বেড়ে খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। সরকার পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দেওয়ার পর চট্টগ্রামে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা দাম কমার খবর এলেও রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলে দাম সামান্যই কমেছে।

বাজার তদারকি তথ্য অনুযায়ী, আড়তদার সিন্ডিকেট সেপ্টেম্বর থেকেই পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি শুরু করে। সর্বশেষ গত দুই দিনে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে তারা বাজার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে নেয় এবং ভরা মৌসুমে আমদানি অনুমতির জন্য সরকারকে চাপ দেয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) উভয়ই দেশে পেঁয়াজের সংকট নেই বলে নিশ্চিত করলেও, অদৃশ্য শক্তির কাছে নত হয়ে শনিবার রাতে বাজার সহনীয় রাখতে সীমিত আকারে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০টি করে আইপি (আমদানি অনুমতি) ইস্যু করা হবে, যেখানে প্রতিটি আইপিতে সর্বোচ্চ ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন থাকবে।

চার দিন আগে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১১০ টাকা, যা অক্টোবরে ছিল ৭০ টাকা। আমদানির ঘোষণার পরও সোমবার (৮ নভেম্বর) প্রতিকেজি পেঁয়াজ ১৪০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়, যা দুই দিন আগে ১৪০-১৬০ টাকা ছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই এবং আমদানির অনুমতি দিতে সরকারকে বাধ্য করতেই সিন্ডিকেটচক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে।

ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেটের সুবিধা

ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন দুবার অনুমতি চেয়েও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাড়া না পাওয়ায় একরকম অনুমতি ছাড়াই প্রতিলিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।

কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে এবং শেষ পর্যন্ত রোববার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করে লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর বৈধতা দেয়। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে ৯ টাকা বাড়ালেও সরকার কিছু কমিয়ে ৬ টাকার বৈধতা দিয়ে প্রকারান্তরে সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা করেছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার কথা না থাকলেও সরকার লিটারে ৬ টাকা বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করেছে এবং ভোক্তার পকেট কেটেছে।

অতীতের কারসাজির চিত্র

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরগুলোতেও অসাধু চক্র একই ধরনের কারসাজি করেছে:

পণ্য২০২৩ সালের শুরুতে দামকারসাজির সর্বোচ্চ দামসরকারের নির্ধারিত দামবাজারে বিক্রয়মূল্য
আলু২০ টাকা/কেজি৪৫-৫০ টাকা/কেজি (জুন)৩৫-৩৬ টাকা/কেজি৪৫-৫০ টাকা/কেজি
পেঁয়াজ৩০ টাকা/কেজি (মার্চ)৯০ টাকা/কেজি (মে)৬৪-৬৫ টাকা/কেজি৮০-৮৫ টাকা/কেজি
ডিম১০ টাকা/পিস (জানুয়ারি)১৪ টাকা/পিস (সেপ্টেম্বর)১২ টাকা/পিস১৩ টাকা/পিস

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এমকে মুজেরী বলেন, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আগে থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি অনিয়ম করলে শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার সুরক্ষা দিতে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন।