বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেছেন যে, বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যার ফলে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আর্থিক খাত এখন একটি টেকসই ভিত্তির দিকে এগোচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ ও ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) বাংলাদেশ অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০২৫’ শীর্ষক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ড. মনসুর জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশে দ্রুত অবমূল্যায়িত মুদ্রা, কমে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, তারল্য সংকট ও বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণের মতো সংকট বিদ্যমান ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিনিময় হার স্থিতিশীল না হলে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয় সম্ভব নয়। দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২০ টাকা ছিল, যা বর্তমানে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক খাত এখন ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এক বছর আগে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছিল, সেখানে বর্তমানে তা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত, আর্থিক হিসাবেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক পরিশোধ ভারসাম্য এখন উদ্বৃত্তে রয়েছে।
গভর্নর স্পষ্ট করে বলেন, এই মুহূর্তে সুদের হার কমানোর কোনো সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি ১২.৫ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশের একটু ওপরে নেমে এলেও বাস্তব সুদহার সামান্য ইতিবাচক রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, মুদ্রানীতি পুরোপুরি বাজারভিত্তিক থাকবে এবং সুদহারে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, সরকারের ঋণ গ্রহণের চাহিদার কারণে অর্থবাজারে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনোভাবেই অর্থছাপার পথে যায়নি।
ড. আহসান এইচ. মনসুর খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বলেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরে কম দেখানো হচ্ছিল। স্বচ্ছতা আনার পর দেখা গেছে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশেরও বেশি, যা অস্বস্তিকর হলেও বাস্তব সত্য। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা যাবে।
তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে, পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসান প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আমানত বীমা আইন, ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহিতা জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশও পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে। গভর্নর জানান, একীভূত নতুন ব্যাংকগুলো প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রথম বা দ্বিতীয় বছরের মধ্যেই লাভজনক হতে পারে এবং যেসব কর্মকর্তা প্রদত্ত ঋণ দ্রুত খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
রিপোর্টারের নাম 























