ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ২০২৩ সালে বাংলাদেশে এসে রাফাল যুদ্ধবিমান বিক্রির যে ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা সম্ভবত ব্যর্থ হতে চলেছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখন ২০টি চীনা J-10CE “ভিগোরাস ড্রাগন” মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে, যার মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই চুক্তিতে ক্রয়, পাইলটদের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ অন্তর্ভুক্ত। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ কিস্তিতে পরিশোধ করা হতে পারে।
এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের পুরনো মিগ-২৯ এবং চীনা এফ-৭-এর মতো বিমানগুলোকে আধুনিকায়ন করতে চাইছে, যা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে ১৬টি চীনা চেংদু জে-৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং দেশটি সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। চীন থেকে অস্ত্র কেনার প্রধান কারণ হলো—এগুলো তুলনামূলকভাবে কম দামি এবং এতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কম থাকে।
রাফালের চেয়ে J-10CE কেন এগিয়ে?
একসময় ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান, বিশেষত ইউরোফাইটার টাইফুন এবং ফ্রান্সের রাফালই বাংলাদেশের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিল। তবে, দুটি প্রধান কারণে এখন চীনের জে-১০সিই এগিয়ে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে:
ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ: ভারত তাদের বিমানবাহিনীতে রাফাল যুক্ত করায় বাংলাদেশ কিছুটা দ্বিধায় ছিল। কারণ, একই মডেলের যুদ্ধবিমান প্রতিবেশী দেশের বিমানবাহিনীতে থাকলে কৌশলগত অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে।
পাকিস্তানের সাফল্য: সম্প্রতি মে ২০২৫-এ ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষের সময় পাকিস্তান বিমানবাহিনী (যারা ২০২২ সাল থেকে জে-১০সি ব্যবহার করছে) দাবি করে যে, তারা জে-১০সি দিয়ে ভারতের রাফাল বিমান ভূপাতিত করেছে (যদিও ভারত এই দাবি অস্বীকার করে)। এই ঘটনা J-10CE-এর প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।
২০২৪ সালে বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের চীন সফরের পরই জে-১০সিই কেনার বিষয়টি BAF-এর আগ্রহের কেন্দ্রে আসে। এরপর চলতি বছরের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের সময় আলোচনা আরও গতি পায়। বর্তমানে বিমানবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে গঠিত ১১ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি এই ‘সরকার-টু-সরকার’ (G2G) চুক্তি চূড়ান্ত করতে এবং দাম ও শর্তাবলী নিয়ে দর কষাকষি করতে চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছে।
জে-১০সিই যুদ্ধবিমানটি ৪.৫ প্রজন্মের একটি মাল্টিরোল ফাইটার, যা অত্যাধুনিক এভিওনিক্স, রাডার এবং দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। এটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পাশাপাশি চীনা বিমানবাহিনীও ব্যবহার করে। এটিতে দেশীয়ভাবে তৈরি AESA রাডার, WS-10B ইঞ্জিন এবং PL-15 এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল যুক্ত আছে। এর ক্ষমতাকে প্রায় আমেরিকান F-16 ফাইটিং ফ্যালকন-এর উন্নত সংস্করণের সমতুল্য মনে করা হয়।
তবে, চীনা সামরিক সরঞ্জামের মান নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অতীতে বাংলাদেশ চীনা করভেট, পেট্রোল ক্রাফট এবং এফ-৭ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তিগত সমস্যা ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহের অভিযোগ তুলেছে। সমালোচকরা মনে করেন, এই নিম্নমানের সরঞ্জামগুলো দেশের সামরিক প্রস্তুতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন তীব্র হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য এই জে-১০সিই চুক্তি একদিকে যেমন সামরিক আধুনিকায়ন, তেমনি অন্যদিকে চীনের সাথে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 























