ঢাকা ০৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ছেলের হাজারো স্মৃতি নিয়ে জীবনযাপন, রায় কার্যকরের ধীরগতিতে স্বজনদের ক্ষোভ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:০১:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩৪ বার পড়া হয়েছে

আজ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্মম নির্যাতনে নিহত এই মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে তার বাবা-মা এখনো শোকে মূহ্যমান। মৃত্যুর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায় কার্যকর না হওয়ায় আবরারের মা রোকেয়া খাতুন ও বাবা বরকত উল্লাহ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ছেলের ছবি, শোকেসে যত্নে সাজানো ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর হাজারো স্মৃতি বুকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন তারা। কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের পাশে আবরার ফাহাদের বাড়িতে এখনও শোকেসে তার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ ব্যবহৃত জিনিসপত্র রয়েছে। বিছানা ও পড়ার টেবিল আগের মতোই আছে, শুধু আবরার নেই। সন্তানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়লে বাবা-মা এখনো শিউরে ওঠেন।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর নিজ হাতে খাইয়ে আবরারকে কুষ্টিয়া থেকে বাসে করে বুয়েটের উদ্দেশ্যে তুলে দিয়েছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। সেটিই ছিল সন্তানের সঙ্গে তার শেষ দেখা। সেদিন রাতেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের শেরে বাংলা হলে অমানবিক নির্যাতন করে আবরার ফাহাদকে হত্যা করে। ছয় বছর পরও ছেলে হত্যার বিচারের রায় কার্যকর না হওয়ায় তারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পলায়নের বিষয়েও আক্ষেপ জানিয়েছেন।

আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন আবরার ফাহাদ দেখেছিলেন, তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নসহ পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানাই। বর্তমানে মা রোকেয়া খাতুন আবরারের ছোট ভাই, যিনি বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, তার সঙ্গেই ঢাকায় বসবাস করেন।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ঘটা এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড এখনও আবরারের পরিবারসহ স্বজনদের তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রতিবেশী ও স্বজনরাও আবরারের খুনিদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত রায় কার্যকরের পাশাপাশি আবরারের স্বপ্নের বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে, ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি গ্রন্থাগার নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, আবরারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি গ্রন্থাগারে আলোচনা সভা, দোয়াসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি অতি দ্রুত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানান।

শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি গ্রন্থাগারের উপদেষ্টা সুলতান মারুফ তালহা আবরারকে এ দেশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তিনি অন্যায় ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষ কীভাবে একা দাঁড়াতে পারে, তা দেখিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, খুনিরা বাইরে ঘুরে বেড়ায় আর আমরা বিছানায় ঘুমাই, এটা লজ্জার। তিনি দ্রুত আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানান।

আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ জানান, আবরার হত্যা মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। তারা আবেদন করেছেন, বিচারটি যেন তাড়াতাড়ি শুরু হয়। তিনি বলেন, দ্রুত শুরু হলে তারা ন্যায়বিচার পাবেন। তিনি আরও জানান, আবরার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে চার জন আসামি এখনও পলাতক রয়েছে। তিনি বলেন, আগে তাদের ধরার উদ্যোগ নিলেও এখন আর অভিযান চালানো হচ্ছে না। তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, এই পলাতক আসামিদের ধরার ব্যবস্থা করা হোক এবং হাইকোর্টে বহাল থাকা রায়টি দ্রুত কার্যকর করা হোক।

উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে বুয়েটের শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও তড়িৎকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মী। রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে পরদিন ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৩ নভেম্বর চার্জশিট দাখিল করা হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আদালত এই মামলায় ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে এসে পৌঁছায় এবং কারাবন্দি আসামিরা আপিল করেন। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সমীকরণ: চীন থেকে অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিসাইল কিনছে ইরান

ছেলের হাজারো স্মৃতি নিয়ে জীবনযাপন, রায় কার্যকরের ধীরগতিতে স্বজনদের ক্ষোভ

আপডেট সময় : ০৫:০১:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫

আজ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্মম নির্যাতনে নিহত এই মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে তার বাবা-মা এখনো শোকে মূহ্যমান। মৃত্যুর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায় কার্যকর না হওয়ায় আবরারের মা রোকেয়া খাতুন ও বাবা বরকত উল্লাহ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ছেলের ছবি, শোকেসে যত্নে সাজানো ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর হাজারো স্মৃতি বুকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন তারা। কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের পাশে আবরার ফাহাদের বাড়িতে এখনও শোকেসে তার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ ব্যবহৃত জিনিসপত্র রয়েছে। বিছানা ও পড়ার টেবিল আগের মতোই আছে, শুধু আবরার নেই। সন্তানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়লে বাবা-মা এখনো শিউরে ওঠেন।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর নিজ হাতে খাইয়ে আবরারকে কুষ্টিয়া থেকে বাসে করে বুয়েটের উদ্দেশ্যে তুলে দিয়েছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। সেটিই ছিল সন্তানের সঙ্গে তার শেষ দেখা। সেদিন রাতেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের শেরে বাংলা হলে অমানবিক নির্যাতন করে আবরার ফাহাদকে হত্যা করে। ছয় বছর পরও ছেলে হত্যার বিচারের রায় কার্যকর না হওয়ায় তারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পলায়নের বিষয়েও আক্ষেপ জানিয়েছেন।

আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন আবরার ফাহাদ দেখেছিলেন, তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নসহ পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানাই। বর্তমানে মা রোকেয়া খাতুন আবরারের ছোট ভাই, যিনি বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, তার সঙ্গেই ঢাকায় বসবাস করেন।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ঘটা এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড এখনও আবরারের পরিবারসহ স্বজনদের তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রতিবেশী ও স্বজনরাও আবরারের খুনিদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত রায় কার্যকরের পাশাপাশি আবরারের স্বপ্নের বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে, ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি গ্রন্থাগার নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, আবরারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি গ্রন্থাগারে আলোচনা সভা, দোয়াসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি অতি দ্রুত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানান।

শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি গ্রন্থাগারের উপদেষ্টা সুলতান মারুফ তালহা আবরারকে এ দেশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তিনি অন্যায় ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষ কীভাবে একা দাঁড়াতে পারে, তা দেখিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, খুনিরা বাইরে ঘুরে বেড়ায় আর আমরা বিছানায় ঘুমাই, এটা লজ্জার। তিনি দ্রুত আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানান।

আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ জানান, আবরার হত্যা মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। তারা আবেদন করেছেন, বিচারটি যেন তাড়াতাড়ি শুরু হয়। তিনি বলেন, দ্রুত শুরু হলে তারা ন্যায়বিচার পাবেন। তিনি আরও জানান, আবরার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে চার জন আসামি এখনও পলাতক রয়েছে। তিনি বলেন, আগে তাদের ধরার উদ্যোগ নিলেও এখন আর অভিযান চালানো হচ্ছে না। তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, এই পলাতক আসামিদের ধরার ব্যবস্থা করা হোক এবং হাইকোর্টে বহাল থাকা রায়টি দ্রুত কার্যকর করা হোক।

উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে বুয়েটের শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও তড়িৎকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মী। রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে পরদিন ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৩ নভেম্বর চার্জশিট দাখিল করা হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আদালত এই মামলায় ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে এসে পৌঁছায় এবং কারাবন্দি আসামিরা আপিল করেন। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।