জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে যখন জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া চূড়ান্ত করা এবং তার বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি দল বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নেমেছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংসদের উভয় কক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু করা এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম-নির্যাতনকারীদের বিচারের মতো পাঁচটি অভিন্ন দাবিতে তারা এই আন্দোলনে নেমেছে। আন্দোলনকারী দলগুলো বলছে, এটি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং তাদের দাবির পক্ষে জনমত গঠনের একটি কৌশল।
তবে প্রশ্ন উঠছে—যেহেতু দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আছে এবং তারা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি, তখন এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কি তাহলে বর্তমানে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিকে চাপের মুখে ফেলা? এই কৌশল নির্বাচন ও আগামী দিনের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে জনমনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক সাঈদ ইফতেখার আহমেদের পর্যবেক্ষণ হলো, ছয় দলের এই আন্দোলনটি ‘বড় লক্ষ্যে’ পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য মনে করেন, এই ধরনের আন্দোলন তাদের দলের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং এ নিয়ে তাদের ‘চাপে থাকার কারণ নেই’।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এই ছয় দল যুগপৎভাবে মিছিল, সমাবেশ ও গণসংযোগের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে। তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে পিআর পদ্ধতি চালু করার বিষয়টিই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, কারণ অন্য দাবিগুলোর সঙ্গে বিএনপির নীতির বড় কোনো দ্বিমত নেই।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ প্রায় শেষের পথে এবং সম্প্রতি দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচনের আগেই একটি গণভোট আয়োজনের বিষয়ে ‘ঐকমত্যে’ পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। তবুও, এই ছয় দল তাদের যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন আরও স্পষ্ট করে বলছে যে, আগামী নির্বাচনে সংসদের উভয় কক্ষেই পিআর পদ্ধতি চালু করতে হবে, যদিও জুলাই সনদে এমনটা বলা নেই।
আন্দোলনকারীরা কেন সংলাপের পাশাপাশি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, এই প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বাংলাদেশে আন্দোলন ও সংলাপ একসাথে চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয় এবং তাদের আন্দোলন ফলপ্রসূ হচ্ছে। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদেরের মতে, এই কর্মসূচি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি সংস্কারের পক্ষে জনমত তৈরি করছে।
এদিকে, ঐকমত্য কমিশনে থাকা অন্যান্য দলের নেতারা এই আন্দোলন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, এটি বিএনপিকে চাপে ফেলার আন্দোলন নয়, তবে আলোচনা টেবিলেই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না আন্দোলনকারীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তারা এই কর্মসূচি দিচ্ছেন। আন্দোলনকারীরা এর জবাবে বলেছেন যে, তারা নিজেদের দাবির পক্ষে কেবল ‘প্রচার’ চালাচ্ছেন, যা মান্নার কাছে কিছুটা দুর্বল যুক্তি মনে হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন এবং সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এই আন্দোলনের সমালোচনা করে বলছেন, এক দিকে সংলাপে অংশ নেওয়া এবং অন্যদিকে রাজপথে একই বিষয়ে কর্মসূচি দেওয়া নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সিপিবি অবশ্য জানিয়েছে, তারাও সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে কয়েক দিনের মধ্যেই কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামবে।
রাজনীতি বিশ্লেষক সাঈদ ইফতেখার আহমেদ মনে করেন, এই আন্দোলনকে নিরীহ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি ভাবা হলেও এটি ‘বড় লক্ষ্যে’ পরিচালিত হচ্ছে। তার মতে, এর আপাত লক্ষ্য নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া এবং বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা। তিনি আরও মনে করেন, এই আন্দোলন ইসলামবাদী রাজনীতির পরস্পরবিরোধী মেরুকে একত্র করছে এবং নির্বাচনের আগে যদি নির্বাচন পেছানো যায়, তা তাদের রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দেবে। বিশেষত, পিআর পদ্ধতির দাবিতে বিএনপির আপত্তির সুযোগ নিয়ে এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন না করার দাবি তুলে ধরে তারা বিএনপিকে একটি কঠিন সংকটে ফেলতে পারে।
অপর বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুই ধারায় রাজনীতি বিন্যস্ত ছিল। এখন আওয়ামী লীগ না থাকায় ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর বিকাশ হচ্ছে এবং তারা বিএনপির বাইরে বিকল্প আরেকটি ধারা তৈরি করার চেষ্টা করছে। তাদের এই বোঝাপড়া যদি নির্বাচন পর্যন্ত টিকে থাকে, তবে তারা বিএনপির বাইরে একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে এবং আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির বাইরে ভোটারদের জন্য একটি নতুন জায়গা তৈরি করতে চাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 























