জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দ্রুতই নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে, কিন্তু তার আগে দলটির প্রতীক নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় জটিলতা। শুরু থেকেই এনসিপি তাদের দলীয় প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা’ দাবি করে আসছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গেজেটভুক্ত প্রতীকের তালিকায় ‘শাপলা’ নেই। এই প্রতীক নিয়েই ইসি এবং এনসিপি দুটি ভিন্ন অবস্থানে অনড় থাকায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ইসি ৫০টি গেজেটভুক্ত প্রতীক থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে এনসিপিকে চিঠি দিলেও, জবাবে এনসিপি আবারও ‘শাপলা’ প্রতীক চেয়ে এর কয়েকটি নমুনা পাঠিয়েছে। এনসিপির স্পষ্ট ঘোষণা— তারা ইসির তালিকাভুক্ত কোনো প্রতীক নেবে না। দলের কোনো কোনো নেতা আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ‘শাপলা’ ছাড়া অন্য কোনো প্রতীক পেলে তারা নির্বাচনেই অংশ নেবেন না। অন্যদিকে, ইসি তাদের গেজেটভুক্ত প্রতীক থেকেই প্রতীক নেওয়ার জন্য এনসিপিকে চাপ দিচ্ছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারবিষয়ক কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলির মতে, ‘শাপলা’ প্রতীক কোনো রাজনৈতিক দলকে দিতে আইনি কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, দেশের জাতীয় প্রতীকে ধানের শীষ, সোনালী আঁশ (পাট) ও তারা চিহ্ন রয়েছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের প্রতীকে দাঁড়িপাল্লা এবং জাতীয় ফল কাঁঠালও ইসির প্রতীকের তালিকায় আছে। তাই ‘শাপলা’ অন্তর্ভুক্ত করতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তিনি মনে করেন, ইসি চাইলে তালিকায় নতুন প্রতীক যুক্ত করার সময় ‘শাপলা’ও যুক্ত করতে পারত। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমঝোতাই একমাত্র পথ। যদি ইসি ‘শাপলা’ প্রতীক না দিতে চায়, তবে তার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, যেহেতু ইসির বিধিতে ‘শাপলা’ নেই, তাই তারা এটি দিতে পারছে না। তাঁর মতে, এনসিপির এই অনড় অবস্থানের কারণে হয়তো ইসি বিধি পরিবর্তন করে ‘শাপলা’ যুক্ত করতে পারে। কিন্তু তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোনো দল যদি চাপ সৃষ্টি করে ইসির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে বাধ্য করে, তবে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা ইসির পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে বড় দলগুলো একই রকম চাপ সৃষ্টি করে, তখন ইসি যদি সবার দাবি মেনে নেয়, তবে ছয় মাসের মধ্যে ‘ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতে পারে’। ড. মালিকের সতর্কবার্তা— ‘শাপলা’ প্রতীক দিলে ইসির নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকার বিষয়টি কঠিন হয়ে যাবে এবং অন্যরা তাদের দাবি মানার জন্য চাপ দেবে। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে কমিশনকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যেহেতু ‘শাপলা’ প্রতীক তফসিলে নেই, তাই তা বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয় এবং এনসিপিকে তা চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শাপলা’ ছাড়া এনসিপি নিবন্ধন নেবে কি না, তা একান্তই তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। তবে তিনি এও জানান, ‘শাপলা’ প্রতীকের দাবির বিষয়ে ইসির সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এনসিপি অবশ্য মনে করছে, কোনো ‘অদৃশ্য শক্তির’ কারণে ইসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ৯ অক্টোবর ইসির সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠক শেষে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, ইসি যদি কোনো দিক থেকে চাপে থাকে, তবে তা খোলাসা করে বললে এনসিপি রাজপথে তাদের মোকাবিলা করবে। ইসি সচিবের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কোনো অদৃশ্য শক্তি পেছনে রেখে আপনি প্রেসারটা নিয়েন না।” তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন, ‘শাপলা’ ছাড়া এনসিপি নিবন্ধন মানবে না এবং তারা এই দাবিতে অনড় থাকবেন। তিনি আরও যুক্তি দেন, যেহেতু ধানের শীষ, সোনালী আঁশ বা তারা চিহ্নের মতো প্রতীক থাকতে পারে, তাই ‘শাপলা’ প্রতীক দিতে আইনি বা রাজনৈতিক কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকার কথা নয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টি শেষ পর্যন্ত তাদের দাবি করা ‘শাপলা’ প্রতীক পাচ্ছে কি না, তার জন্য এখন নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সভার সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 























