বিগত সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশের সীমানা থেকে বঙ্গোপসাগরের তলদেশের বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ভারত গোপনে সরিয়ে নিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিনা রক্তপাতে এবং সম্পূর্ণ নীরবে হওয়া এই বিশাল সম্পদ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য দীর্ঘ সময় পর ফাঁস করেছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম পরাশক্তি চীন। এই ঘটনার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ রাজনীতি এবং জ্বালানি খাতে এক নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে যা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী গ্যাস উচ্চ চাপ থেকে নিম্ন চাপের দিকে প্রবাহিত হয়। এই অমোঘ নিয়মকে কাজে লাগিয়ে ভারত তাদের নিজস্ব সীমান্তে সরাসরি মাটির নিচে খনন না করে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনাকুনিভাবে বাংলাদেশের গ্যাসভাণ্ডারে পাইপ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই বাঁকা পথে খনন বা স্ল্যান্ট ড্রিলিং পদ্ধতির মাধ্যমে সজোরে গ্যাস বের করে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রে একটি কৃত্রিম নিম্ন চাপের সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ প্রাকৃতিক নিয়মেই বাংলাদেশের অন্য প্রান্তের গ্যাস ভারতের পাইপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ঠিক একইভাবে উনিশ শত নব্বই সালে ইরাকও কুয়েতের বিরুদ্ধে তাদের সীমানা লঙ্ঘন করে বাঁকা পাইপ দিয়ে তেল চুরির অভিযোগ তুলেছিল।
দুই হাজার বারো সালে সমুদ্র জয়ের পর বঙ্গোপসাগরে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেলেও তৎকালীন সরকার কোনো আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই ভারতের দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে এর দায়িত্ব প্রদান করে। অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পার হলেও ভারতীয় কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেনি বরং নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে ব্লকগুলোকে অচল করে রেখেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি ছিল দিল্লির সুদূরপ্রসারী কৌশল যার সুযোগ নিয়ে ভারত নিজেদের ব্লকে দিনরাত গ্যাস উত্তোলন করেছে এবং ভূগর্ভস্থ সংযোগের কারণে বাংলাদেশের গ্যাস ধীরে ধীরে তাদের সীমানায় চলে গেছে।
সমুদ্র তলদেশের এই ঘটনার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর। নিজস্ব গ্যাস উত্তোলিত না হওয়ায় দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয় এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করতে হয়। এর ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যায় এবং গ্যাসের অভাবে পোশাক শিল্পসহ সামগ্রিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও সম্পদ রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। কূটনৈতিক সূত্রমতে চীন তাদের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের নিচে ভারতের এই কৌশলী গ্যাস উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বাংলাদেশের হাতে তুলে দিয়েছে। শুধু তাই নয় দীর্ঘমেয়াদি এই জ্বালানি সংকট নিরসনে চীন সাশ্রয়ী খরচে গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের একচেটিয়া প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে একটি কৌশলগত জ্বালানি চুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি নির্ভরতা অর্জন করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























