চলতি জুন মাসজুড়ে একের পর এক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত চার দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। যদিও এসব কম্পনে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবুও ঘন ঘন ভূকম্পন জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট ভূমিকম্পকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলা না গেলেও বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এবং সক্রিয় ফল্ট লাইনের কারণে পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
২২ জুন: সর্বশেষ কম্পনে কেঁপে ওঠে ঢাকা
সবশেষ ২২ জুন রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রাতের এই আকস্মিক কম্পনে অনেকেই বাসা থেকে বের হয়ে আসেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
১৮ জুন: মণিপুর সীমান্তে উৎপত্তি
এর আগে ১৮ জুন রাত ৯টা ২৯ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার প্রায় ৩৬১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভারতের মণিপুর এলাকায়।
১১ জুন: শিলচর কেন্দ্রিক কম্পন
১১ জুন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে দেশজুড়ে আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ইউরোপীয় মেডিটেরেনিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্য অনুযায়ী, এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৫।
ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভারতের শিলচর, যা সিলেটের করিমগঞ্জ সীমান্তের কাছে অবস্থিত। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপন্ন হওয়ায় সিলেট, ময়মনসিংহ এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
৭ জুন: সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন
চলতি মাসের প্রথম বড় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ভুটানের থিম্পুর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।
এর প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে ঢাকাসহ মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবল কম্পন অনুভূত হয়। অনেক মানুষ আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, চারটি ভূমিকম্পের কোনোটিতেই দেশে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
কেন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতারের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য প্রধান দুটি ভূমিকম্প উৎস হলো—
- উত্তরের ডাউকি ফল্ট।
- পূর্বাঞ্চলে সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত সাবডাকশন জোন।
তিনি বলেন, এই সাবডাকশন জোনে ভারতীয় প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংযোগস্থলে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো বিপুল শক্তি জমা রয়েছে।
অধ্যাপক হুমায়ুনের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এই ফল্ট লাইনের বড় অংশ বর্তমানে ‘লকড’ অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তি ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমে বের হচ্ছে না; বরং ক্রমাগত সঞ্চিত হচ্ছে।
তার মতে, এই সঞ্চিত শক্তি একসময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে বহুতল ভবন থেকে দৌড়ে নিচে নামা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি।
বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড’ পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ড্রপ (Drop)
কম্পন শুরু হওয়া মাত্রই হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে বসে পড়ুন।
কাভার (Cover)
শক্ত টেবিল, খাট বা বিমের নিচে আশ্রয় নিন। হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন।
হোল্ড (Hold)
কম্পন থেমে না যাওয়া পর্যন্ত আশ্রয়স্থলটি শক্তভাবে ধরে থাকুন।
সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতারের মতে, ভূমিকম্প মোকাবিলায় শুধু দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা।
তিনি বলেন, দেশের তরুণদের সম্পৃক্ত করে প্রাকৃতিক দুর্যোগভিত্তিক ডিজিটাল গেম তৈরি করা গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভূমিকম্প বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
এ ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া এবং সতর্কীকরণ অনুশীলনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তার মতে, দুর্যোগের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে নিয়মিত প্রস্তুতি ও সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
রিপোর্টারের নাম 

























