ঢাকা ০৪:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬

সাতক্ষীরার বিলুপ্তপ্রায় পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি

সাতক্ষীরা জেলার একসময়ের বিখ্যাত ও পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প আজ চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া এবং বাজারে প্লাস্টিকের তৈরি বিকল্প পণ্যের দাপটে এই শিল্পের কদর অনেকটাই কমে গেছে। পাশাপাশি পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে তাদের পৈতৃক এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। তবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও জেলার আশাশুনি ও তালা উপজেলার প্রায় তিন শতাধিক পরিবার কেবল নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এখনও মাদুর বোনার কাজ করে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া পরিবেশবান্ধব এই প্রাচীন গ্রামীণ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব।

একসময় সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা বিশেষ করে আশাশুনি উপজেলার বড়দল এবং কুল্যা ও কাদাকাটি ইউনিয়নে প্রচুর পরিমাণে মেলে ঘাস জন্মাতো যা দিয়ে এসব মাদুর তৈরি করা হতো। সেসময় এই ঘাসকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো। দক্ষিণ খুলনার অন্যতম বৃহৎ বড়দল এবং বুধহাটা হাটে প্রতি সপ্তাহে প্রচুর মাদুর পাইকারি ও খুচরা দামে বিক্রি হতো যা পরবর্তীতে খুলনা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক জীবনে তোষক এবং বিছানার চাদর ও প্লাস্টিকের মাদুরের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই মাদুরের চাহিদা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এছাড়া মেলে ঘাসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বাকিতে কাঁচামাল কেনার কারণে কারিগরদের লাভের পরিমাণ এখন খুবই সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে।

স্থানীয় কারিগরদের মতে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে নারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। বড়দল গ্রামের মাদুর কারিগর সুধীর মণ্ডল এবং তার স্ত্রী সরলা রাণী মণ্ডল জানান যে একটি ছোট মাদুর তৈরিতে দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা খরচ হয় যা বাজারে বিক্রি হয় সর্বোচ্চ তিনশ পঞ্চাশ টাকায়। অন্যদিকে বড় আকারের মাদুর তৈরিতে সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা খরচ হলেও তা বিক্রি করে মাত্র পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা লাভ থাকে। এই সামান্য আয়ে তাদের সংসার চালানো ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো এখন চরম কঠিন হয়ে পড়েছে। কচুয়া গ্রামের মাদুর ব্যবসায়ী লুৎফর মোড়লও জানান যে বাজারে এখন আর আগের মতো মাদুরের চাহিদা নেই এবং তাদের ব্যবসার মুনাফাও একেবারে কমে গেছে।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বা বিসিকের পক্ষ থেকে আশার কথা শোনানো হয়েছে। বিসিক শিল্পনগরী সাতক্ষীরার উপ ব্যবস্থাপক গৌরব দাস জানান যে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি এর বাজার সম্প্রসারণের জন্য তারা কাজ শুরু করেছেন। মাদুর কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের আর্থিক সংকট দূর করতে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। সঠিক সরকারি উদ্যোগ এবং আর্থিক সহায়তা পেলে সাতক্ষীরার এই সম্ভাবনাময় মাদুর শিল্প আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের আইন আধুনিকায়নের উদ্যোগ

সাতক্ষীরার বিলুপ্তপ্রায় পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি

আপডেট সময় : ০৩:১৬:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

সাতক্ষীরা জেলার একসময়ের বিখ্যাত ও পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প আজ চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া এবং বাজারে প্লাস্টিকের তৈরি বিকল্প পণ্যের দাপটে এই শিল্পের কদর অনেকটাই কমে গেছে। পাশাপাশি পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে তাদের পৈতৃক এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। তবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও জেলার আশাশুনি ও তালা উপজেলার প্রায় তিন শতাধিক পরিবার কেবল নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এখনও মাদুর বোনার কাজ করে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া পরিবেশবান্ধব এই প্রাচীন গ্রামীণ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব।

একসময় সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা বিশেষ করে আশাশুনি উপজেলার বড়দল এবং কুল্যা ও কাদাকাটি ইউনিয়নে প্রচুর পরিমাণে মেলে ঘাস জন্মাতো যা দিয়ে এসব মাদুর তৈরি করা হতো। সেসময় এই ঘাসকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো। দক্ষিণ খুলনার অন্যতম বৃহৎ বড়দল এবং বুধহাটা হাটে প্রতি সপ্তাহে প্রচুর মাদুর পাইকারি ও খুচরা দামে বিক্রি হতো যা পরবর্তীতে খুলনা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক জীবনে তোষক এবং বিছানার চাদর ও প্লাস্টিকের মাদুরের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই মাদুরের চাহিদা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এছাড়া মেলে ঘাসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বাকিতে কাঁচামাল কেনার কারণে কারিগরদের লাভের পরিমাণ এখন খুবই সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে।

স্থানীয় কারিগরদের মতে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে নারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। বড়দল গ্রামের মাদুর কারিগর সুধীর মণ্ডল এবং তার স্ত্রী সরলা রাণী মণ্ডল জানান যে একটি ছোট মাদুর তৈরিতে দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা খরচ হয় যা বাজারে বিক্রি হয় সর্বোচ্চ তিনশ পঞ্চাশ টাকায়। অন্যদিকে বড় আকারের মাদুর তৈরিতে সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা খরচ হলেও তা বিক্রি করে মাত্র পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা লাভ থাকে। এই সামান্য আয়ে তাদের সংসার চালানো ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো এখন চরম কঠিন হয়ে পড়েছে। কচুয়া গ্রামের মাদুর ব্যবসায়ী লুৎফর মোড়লও জানান যে বাজারে এখন আর আগের মতো মাদুরের চাহিদা নেই এবং তাদের ব্যবসার মুনাফাও একেবারে কমে গেছে।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বা বিসিকের পক্ষ থেকে আশার কথা শোনানো হয়েছে। বিসিক শিল্পনগরী সাতক্ষীরার উপ ব্যবস্থাপক গৌরব দাস জানান যে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি এর বাজার সম্প্রসারণের জন্য তারা কাজ শুরু করেছেন। মাদুর কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের আর্থিক সংকট দূর করতে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। সঠিক সরকারি উদ্যোগ এবং আর্থিক সহায়তা পেলে সাতক্ষীরার এই সম্ভাবনাময় মাদুর শিল্প আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।