ঢাকা ০২:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পিলখানা ট্র্যাজেডির স্মৃতি: “আবার দেখা হবে” – এক মায়ের হাহাকার

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৮:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার পিলখানা বিডিআর সদরদপ্তরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঠিক আগে, নিজের মাকে এবং স্ত্রীকে শেষবারের মতো ফোন করে শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমান (সোহেল) বলেছিলেন, “আবার দেখা হবে।” এই কথাটিই আজও তার মা খোদেজা রহমানের কানে বাজছে, যা তাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সম্প্রতি, বিডিআর ট্র্যাজেডিতে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে বরিশাল এক্স-ক্যাডেট’স অ্যাসোসিয়েশন ঢাকার ধামরাইয়ের পৌর এলাকায় একটি স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করে। এই স্বাস্থ্য শিবিরের একটি আলোচনা সভায় নিজের ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শহীদ মেজর মাহবুবের মা খোদেজা রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি ছেলের শেষ মুহূর্তের স্মৃতিসহ নানা ঘটনা তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সকলের মনে গভীর রেখাপাত করে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করা শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমান, বিডিআরে যোগদানের আগে সর্বশেষ শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে ফেরার পর তার বিডিআরে পদায়ন হয়। ঘটনার দিন, অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে, একটি ক্ষুদে বার্তা পেয়ে পরদিন তাকে যোগদান করতে বলা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে তিনি তার মা ও স্ত্রীকে শেষবারের মতো ফোন করেন। এরপরই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান এবং দুই দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ছেলেকে স্মরণ করে খোদেজা রহমান জানান, ছোটবেলা থেকেই মাহবুবের স্বপ্ন ছিল একজন আর্মি অফিসার হওয়ার। মেধাবী ও পড়াশোনায় অত্যন্ত আগ্রহী মাহবুব ক্লাস টু থেকেই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনা করত। পরিবারের এক শোক তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তার দেবর মেজর সফুর রহমানের মৃত্যুর সময় যখন পরিবার ভেঙে পড়েছিল, তখন ছোট্ট মাহবুব তাদের সাহস জুগিয়ে বলেছিল, “ভয় পেয়ো না, আমিও মেজর হব, আমিও আর্মি অফিসার হব।”

ছোটবেলা থেকেই মাহবুবের ব্যক্তিত্ব ছিল স্বতন্ত্র। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়ও সে বড়দের বই দেখত এবং শেখার চেষ্টা করত। একবার এক সেনা কর্মকর্তা তাদের বাড়িতে এসে গভীর রাতে মাহবুবকে পড়াশোনা করতে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। যখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তখন মাহবুবের মা জানিয়েছিলেন যে তার স্বপ্ন একজন আর্মি অফিসার হওয়া। সেই কর্মকর্তা তাকে দোয়া করেছিলেন, যেন সে একদিন সফল হয়।

পড়াশোনায় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় মাহবুব ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেলেও, দেশের জন্য কাজ করার অদম্য ইচ্ছা থেকে সে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সে দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার সাথে কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিল।

ঘটনার দিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে খোদেজা রহমান বলেন, ২৪ তারিখ রাতে একটি এসএমএসের মাধ্যমে তাকে পিলখানায় ডাকা হয়, যদিও সেদিন তার যাওয়ার কথা ছিল না। সকালে বের হওয়ার সময় তার স্ত্রীও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত সকালে কেন যেতে হচ্ছে। মাহবুব বলেছিল, “সবার সঙ্গে দেখা হবে।” এরপর ড্রাইভারকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে সে নিজেই ভেতরে প্রবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় গোলাগুলি। সেই সময় খোদেজা রহমান এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে কেন্দ্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। হঠাৎ ছেলে ফোন করে তার অবস্থান জানতে চায়। তিনি যখন পরীক্ষার হলের কথা জানান, তখন ছেলে শুধু বলেছিল, “আচ্ছা, ভালো থাকেন। আবার দেখা হবে।” একই কথা সে তার স্ত্রীকেও বলেছিল। পরে তার মনে হয়েছে, হয়তো তখনই সে বুঝতে পেরেছিল ভেতরে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটতে যাচ্ছে।

এরপর দুই দিন পর্যন্ত পরিবার কোনো খবর পায়নি। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়, কিন্তু সেই মরদেহও পরিবারকে ভালোভাবে দেখতে দেওয়া হয়নি বলে জানান খোদেজা রহমান। সেই স্মৃতি মনে পড়লে আজও তিনি ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এটি কেবল একজন মা-ই বুঝতে পারেন।

ছেলের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তার মতো এমন দুঃখ যেন আর কোনো মায়ের জীবনে না আসে। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি আর কিছু বলতে পারছি না।”

এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে সংসদ সদস্য আলহাজ্ব তমিজউদ্দিন।

দিনব্যাপী এই স্বাস্থ্য শিবিরে কয়েকশ মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ঔষধ প্রদান করা হয়। এতে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমানের সহপাঠী চিকিৎসকরা।

এর আগে, সকালে শহীদ সেনা দিবসের ১৭তম বার্ষিকীতে ধামরাইয়ে মেজর মাহবুবের স্মরণে তার কবরস্থানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থেকে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

পিলখানা ট্র্যাজেডির স্মৃতি: “আবার দেখা হবে” – এক মায়ের হাহাকার

আপডেট সময় : ১১:০৮:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঢাকার পিলখানা বিডিআর সদরদপ্তরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঠিক আগে, নিজের মাকে এবং স্ত্রীকে শেষবারের মতো ফোন করে শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমান (সোহেল) বলেছিলেন, “আবার দেখা হবে।” এই কথাটিই আজও তার মা খোদেজা রহমানের কানে বাজছে, যা তাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সম্প্রতি, বিডিআর ট্র্যাজেডিতে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে বরিশাল এক্স-ক্যাডেট’স অ্যাসোসিয়েশন ঢাকার ধামরাইয়ের পৌর এলাকায় একটি স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করে। এই স্বাস্থ্য শিবিরের একটি আলোচনা সভায় নিজের ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শহীদ মেজর মাহবুবের মা খোদেজা রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি ছেলের শেষ মুহূর্তের স্মৃতিসহ নানা ঘটনা তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সকলের মনে গভীর রেখাপাত করে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করা শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমান, বিডিআরে যোগদানের আগে সর্বশেষ শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে ফেরার পর তার বিডিআরে পদায়ন হয়। ঘটনার দিন, অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে, একটি ক্ষুদে বার্তা পেয়ে পরদিন তাকে যোগদান করতে বলা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে তিনি তার মা ও স্ত্রীকে শেষবারের মতো ফোন করেন। এরপরই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান এবং দুই দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ছেলেকে স্মরণ করে খোদেজা রহমান জানান, ছোটবেলা থেকেই মাহবুবের স্বপ্ন ছিল একজন আর্মি অফিসার হওয়ার। মেধাবী ও পড়াশোনায় অত্যন্ত আগ্রহী মাহবুব ক্লাস টু থেকেই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনা করত। পরিবারের এক শোক তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তার দেবর মেজর সফুর রহমানের মৃত্যুর সময় যখন পরিবার ভেঙে পড়েছিল, তখন ছোট্ট মাহবুব তাদের সাহস জুগিয়ে বলেছিল, “ভয় পেয়ো না, আমিও মেজর হব, আমিও আর্মি অফিসার হব।”

ছোটবেলা থেকেই মাহবুবের ব্যক্তিত্ব ছিল স্বতন্ত্র। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়ও সে বড়দের বই দেখত এবং শেখার চেষ্টা করত। একবার এক সেনা কর্মকর্তা তাদের বাড়িতে এসে গভীর রাতে মাহবুবকে পড়াশোনা করতে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। যখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তখন মাহবুবের মা জানিয়েছিলেন যে তার স্বপ্ন একজন আর্মি অফিসার হওয়া। সেই কর্মকর্তা তাকে দোয়া করেছিলেন, যেন সে একদিন সফল হয়।

পড়াশোনায় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় মাহবুব ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেলেও, দেশের জন্য কাজ করার অদম্য ইচ্ছা থেকে সে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সে দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার সাথে কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিল।

ঘটনার দিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে খোদেজা রহমান বলেন, ২৪ তারিখ রাতে একটি এসএমএসের মাধ্যমে তাকে পিলখানায় ডাকা হয়, যদিও সেদিন তার যাওয়ার কথা ছিল না। সকালে বের হওয়ার সময় তার স্ত্রীও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত সকালে কেন যেতে হচ্ছে। মাহবুব বলেছিল, “সবার সঙ্গে দেখা হবে।” এরপর ড্রাইভারকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে সে নিজেই ভেতরে প্রবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় গোলাগুলি। সেই সময় খোদেজা রহমান এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে কেন্দ্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। হঠাৎ ছেলে ফোন করে তার অবস্থান জানতে চায়। তিনি যখন পরীক্ষার হলের কথা জানান, তখন ছেলে শুধু বলেছিল, “আচ্ছা, ভালো থাকেন। আবার দেখা হবে।” একই কথা সে তার স্ত্রীকেও বলেছিল। পরে তার মনে হয়েছে, হয়তো তখনই সে বুঝতে পেরেছিল ভেতরে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটতে যাচ্ছে।

এরপর দুই দিন পর্যন্ত পরিবার কোনো খবর পায়নি। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়, কিন্তু সেই মরদেহও পরিবারকে ভালোভাবে দেখতে দেওয়া হয়নি বলে জানান খোদেজা রহমান। সেই স্মৃতি মনে পড়লে আজও তিনি ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এটি কেবল একজন মা-ই বুঝতে পারেন।

ছেলের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তার মতো এমন দুঃখ যেন আর কোনো মায়ের জীবনে না আসে। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি আর কিছু বলতে পারছি না।”

এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে সংসদ সদস্য আলহাজ্ব তমিজউদ্দিন।

দিনব্যাপী এই স্বাস্থ্য শিবিরে কয়েকশ মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ঔষধ প্রদান করা হয়। এতে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমানের সহপাঠী চিকিৎসকরা।

এর আগে, সকালে শহীদ সেনা দিবসের ১৭তম বার্ষিকীতে ধামরাইয়ে মেজর মাহবুবের স্মরণে তার কবরস্থানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থেকে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন।