ঢাকা ০২:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সীমান্ত দিয়ে আসছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভারতীয় ‘পাওয়ার জেল’; নাশকতার আশঙ্কায় জনমনে উদ্বেগ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:২৪:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

সিলেটের তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত ভারত সীমান্ত এখন অবৈধ বিস্ফোরক চোরাচালানের প্রধান রুট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরকের চালান লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যা জনমনে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। গত এক সপ্তাহে র‍্যাব-৯ সিলেটের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চারটি বড় বিস্ফোরকের চালান উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকের প্যাকেটের গায়ে প্রস্তুতকারক দেশ হিসেবে ভারতের নাম লেখা রয়েছে।

১. সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযান ও বিস্ফোরকের ধরণ

র‍্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয়ের চুনাপাথর খনিতে পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত ‘পাওয়ার জেল’ এবং ‘ইলেকট্রিক ও নন-ইলেকট্রিক ডেটোনেটর’ চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

  • শুক্রবার রাত: কানাইঘাটের দিঘিরপাড়ে একটি পরিত্যক্ত স্কুল ভবন থেকে ২৫টি পাওয়ার জেল ও ২৭টি ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উদ্ধার।
  • বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা: গোয়াইনঘাটের পশ্চিম আলীরগাঁওয়ে বন বিভাগের পরিত্যক্ত ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে ৮টি পাওয়ার জেল ও ৮টি ডেটোনেটর উদ্ধার।
  • বুধবার রাত: তাহিরপুরের বারেকেরটিলা থেকে ১.১২৫ কেজি পাওয়ার জেল ও ১৬টি ডেটোনেটর উদ্ধার।
  • ২৩ জানুয়ারি: দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকায় পরিত্যক্ত রেলওয়ে টয়লেট থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার।

২. র‍্যাবের পরিসংখ্যান ও শঙ্কা

র‍্যাব-৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে:

  • ভারতীয় বিস্ফোরক: ১১ কেজি ৭৪০ গ্রাম।
  • ডেটোনেটর: ৭৮টি।
  • আগ্নেয়াস্ত্র: ৪০টি (দেশি-বিদেশি)।
  • অন্যান্য: ১০৪ রাউন্ড গুলি, ১টি সাউন্ড গ্রেনেড, ৫টি পেট্রোল বোমা এবং ১১টি ককটেল।

র‍্যাব-৯-এর মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানিয়েছেন, এই পাওয়ার জেল ও ডেটোনেটরগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অপরাধী চক্র এগুলো নাশকতার উদ্দেশ্যে দেশে নিয়ে আসছে বলে তাঁদের প্রাথমিক ধারণা।

৩. রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিক্রিয়া

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, “লুট হওয়া অস্ত্র এবং ফ্যাসিস্টদের দোসরদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে এখনই সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন।”
  • আইনজীবী নেতা ই ইউ শহিদুল ইসলাম শাহীন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে এই চোরাচালান রুট বন্ধ এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না গেলে নির্বাচনের আগে নাশকতার বড় ঝুঁকি থেকে যাবে।”

৪. সীমান্ত নিরাপত্তা ও চ্যালেঞ্জ

সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকাগুলো পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত হওয়ায় বিজিবির নজরদারি এড়িয়ে চোরাকারবারিরা সক্রিয় থাকছে। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত এসব চালানের সাথে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি, যা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।


নির্বাচনের আগে জনমনে আস্থা ফেরাতে এবং শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

সীমান্ত দিয়ে আসছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভারতীয় ‘পাওয়ার জেল’; নাশকতার আশঙ্কায় জনমনে উদ্বেগ

আপডেট সময় : ০২:২৪:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিলেটের তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত ভারত সীমান্ত এখন অবৈধ বিস্ফোরক চোরাচালানের প্রধান রুট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরকের চালান লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যা জনমনে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। গত এক সপ্তাহে র‍্যাব-৯ সিলেটের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চারটি বড় বিস্ফোরকের চালান উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকের প্যাকেটের গায়ে প্রস্তুতকারক দেশ হিসেবে ভারতের নাম লেখা রয়েছে।

১. সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযান ও বিস্ফোরকের ধরণ

র‍্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয়ের চুনাপাথর খনিতে পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত ‘পাওয়ার জেল’ এবং ‘ইলেকট্রিক ও নন-ইলেকট্রিক ডেটোনেটর’ চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

  • শুক্রবার রাত: কানাইঘাটের দিঘিরপাড়ে একটি পরিত্যক্ত স্কুল ভবন থেকে ২৫টি পাওয়ার জেল ও ২৭টি ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উদ্ধার।
  • বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা: গোয়াইনঘাটের পশ্চিম আলীরগাঁওয়ে বন বিভাগের পরিত্যক্ত ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে ৮টি পাওয়ার জেল ও ৮টি ডেটোনেটর উদ্ধার।
  • বুধবার রাত: তাহিরপুরের বারেকেরটিলা থেকে ১.১২৫ কেজি পাওয়ার জেল ও ১৬টি ডেটোনেটর উদ্ধার।
  • ২৩ জানুয়ারি: দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকায় পরিত্যক্ত রেলওয়ে টয়লেট থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার।

২. র‍্যাবের পরিসংখ্যান ও শঙ্কা

র‍্যাব-৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে:

  • ভারতীয় বিস্ফোরক: ১১ কেজি ৭৪০ গ্রাম।
  • ডেটোনেটর: ৭৮টি।
  • আগ্নেয়াস্ত্র: ৪০টি (দেশি-বিদেশি)।
  • অন্যান্য: ১০৪ রাউন্ড গুলি, ১টি সাউন্ড গ্রেনেড, ৫টি পেট্রোল বোমা এবং ১১টি ককটেল।

র‍্যাব-৯-এর মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানিয়েছেন, এই পাওয়ার জেল ও ডেটোনেটরগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অপরাধী চক্র এগুলো নাশকতার উদ্দেশ্যে দেশে নিয়ে আসছে বলে তাঁদের প্রাথমিক ধারণা।

৩. রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিক্রিয়া

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, “লুট হওয়া অস্ত্র এবং ফ্যাসিস্টদের দোসরদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে এখনই সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন।”
  • আইনজীবী নেতা ই ইউ শহিদুল ইসলাম শাহীন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে এই চোরাচালান রুট বন্ধ এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না গেলে নির্বাচনের আগে নাশকতার বড় ঝুঁকি থেকে যাবে।”

৪. সীমান্ত নিরাপত্তা ও চ্যালেঞ্জ

সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকাগুলো পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত হওয়ায় বিজিবির নজরদারি এড়িয়ে চোরাকারবারিরা সক্রিয় থাকছে। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত এসব চালানের সাথে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি, যা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।


নির্বাচনের আগে জনমনে আস্থা ফেরাতে এবং শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।