সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগর থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল-গ্যাস উৎপাদনে এখনও সফল হতে পারেনি বাংলাদেশ। একই সময়ে প্রতিবেশী মিয়ানমার সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলন করে রপ্তানি করছে, ভারতও গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস উৎপাদনে এগিয়ে গেছে। এমন বাস্তবতায় নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন করে আবারও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আর্থিক সুবিধা বাড়ালেই হবে না; দীর্ঘদিনের তথ্যঘাটতি, অনুসন্ধানে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা, বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সীমিত সক্ষমতার মতো সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। অন্যথায় নতুন উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
বাংলাদেশ অতীতে একাধিকবার সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নেমেছে। তবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে কেবল সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রে। ১৯৯৮ সালে উৎপাদন শুরু হলেও মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে ওই ক্ষেত্রের গ্যাস মজুদ শেষ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অতিরিক্ত উত্তোলন এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব সাঙ্গুর দ্রুত অবসানের অন্যতম কারণ ছিল।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক গ্যাসের সন্ধান মেলেনি অথবা আর্থিক শর্তে অসন্তুষ্ট হয়ে কোম্পানিগুলো কাজ ছেড়ে চলে গেছে। সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর ২৬টি ব্লক নির্ধারণ করা হলেও সেগুলোর বড় অংশে এখনও কার্যকর অনুসন্ধান শুরু হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো পর্যাপ্ত ভূতাত্ত্বিক তথ্য ও সাইসমিক জরিপের অভাব। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো বড় বিনিয়োগের আগে নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার চায়, কিন্তু বঙ্গোপসাগরের অনেক ব্লকের ক্ষেত্রে সেই তথ্য এখনও সীমিত। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. বদরুদ্দোজা মিয়া মনে করেন, বাংলাদেশ অনুসন্ধানে অনেক দেরি করে ফেলেছে। তার ভাষায়, প্রতিবেশী দেশগুলো যখন গ্যাস উত্তোলন করছে, তখন বাংলাদেশ এখনও সম্ভাবনা যাচাইয়ের পর্যায়েই রয়েছে। তবে তিনি এটিকে ‘দেরিতে হলেও সঠিক উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের মতে, আগের দরপত্রগুলো আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত সুবিধা দিতে পারেনি। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের ঝুঁকিভীতি কাজ করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন মনে করেন, সমুদ্র অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকাও বড় সমস্যা। তার মতে, বিদেশি কোম্পানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ার কারণে বাংলাদেশ নিজস্ব দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা গড়ে তুলতে পারেনি।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এবার পিএসসিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন চুক্তিতে কোম্পানিগুলোকে মুনাফা বিদেশে নেওয়ার সুযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্যাসমূল্য, শতভাগ ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুবিধা এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের আশা, এসব পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়বে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত শর্ত বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং অনুসন্ধান তথ্যের মানের ওপর।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো সীমান্তঘেঁষা গ্যাস কাঠামো। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাংলাদেশ অনুসন্ধানে পিছিয়ে থাকলে ভারত বা মিয়ানমার তাদের অংশে উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে যৌথ ভূগর্ভস্থ সম্পদের একটি অংশ বাংলাদেশের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীল। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে—নতুন দরপত্রে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো সাড়া দেবে কি না এবং অনুসন্ধানে সত্যিই বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মিলবে কি না। কারণ জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, অনুসন্ধানের সাফল্যের কোনো শতভাগ নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু অনুসন্ধান ছাড়া সম্ভাবনার দরজাও কখনো খুলবে না।
রিপোর্টারের নাম 





















