স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটি ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সুপারিশ করেছে, যা দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে, সিডিপির চেয়ারম্যান অধ্যাপক José Antonio Ocampo বাংলাদেশ সরকারকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন। কমিটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া যৌক্তিক হবে।
তবে সিডিপি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, এই অতিরিক্ত সময় কোনোভাবেই সংস্কার কার্যক্রমে শৈথিল্য আনার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। বরং বর্ধিত সময়কে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদারের জন্য কাজে লাগাতে হবে।
এর আগে চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সিডিপির কাছে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করে। পরে গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।
সিডিপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি প্রধান সূচক—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস—সবকটিতেই প্রয়োজনীয় সীমা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অতিক্রম করেছে। শুধু তাই নয়, নিকট ও মধ্যমেয়াদে এসব সূচকে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও খুব কম।
তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিবেশ বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছে কমিটি। এসব কারণ বিবেচনায় নিয়েই প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে তারা।
সিডিপি বাংলাদেশের প্রণীত ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ বা উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতি পরিকল্পনারও প্রশংসা করেছে। সংস্থাটির মতে, অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে পারবে এবং উত্তরণ-পরবর্তী বাজার সুবিধা, বাণিজ্যিক সুযোগ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার জন্য কার্যকর প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হবে।
কমিটি আরও বলেছে, এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন অব্যাহত রাখা জরুরি। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অনেক বিশেষ সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে, যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সিডিপি বিশেষভাবে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, কর আদায় বৃদ্ধি, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের মতে, এই বর্ধিত সময়কে সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন হলেও এর সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের শর্ত কঠোর হওয়া এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়গুলো সামনে আসবে। ফলে প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সরকার সিডিপির এই ইতিবাচক মূল্যায়ন ও সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে। সরকারের আশা, চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার, বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি টেকসই ও সফল এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অতিরিক্ত তিন বছর শুধু সময় বাড়ানো নয়; বরং উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের সামনে তৈরি হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ফলে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো।
রিপোর্টারের নাম 























