ঢাকা ০২:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

হামে মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালেও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক, স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ বলছেন বিশেষজ্ঞরা

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশু মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৬০৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, সরকার যে তথ্য প্রকাশ করছে তা প্রকৃত পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে না। বিশেষ করে ‘সন্দেহজনক হামে মৃত্যু’ নামে আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশকে তারা বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৫ জুন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯১ শিশু। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৫১৪ জনের। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশই ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্তমানে দেশে যেভাবে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে হামের উপসর্গ থাকা অধিকাংশ মৃত্যুকেই হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। জাতীয় টিকাদান ও কারিগরি পরামর্শক দলের সদস্য এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মহামারী পরিস্থিতিতে শুধু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা ধরে মৃত্যুর হিসাব করলে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাদের মতে, হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুবরণ করা শিশুদের অধিকাংশই কার্যত হামের কারণেই প্রাণ হারাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের একজন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেসব শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়ে মৃত্যু ঘটছে, তাদের আলাদা করে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করার যৌক্তিকতা নেই। কারণ বাস্তবতা বিবেচনায় এসব মৃত্যুও হামের সঙ্গেই সম্পর্কিত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘সন্দেহজনক’ শব্দটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তিনি মনে করেন, অন্তত ‘সম্ভাব্য হামজনিত মৃত্যু’ হিসেবে এসব ঘটনা উল্লেখ করা উচিত ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য তাদের অবস্থানে অনড়। সংস্থাটির দাবি, পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া রোগীদের মৃত্যুকেই ‘নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অন্য জটিলতায় মারা যাচ্ছে, তাদের আলাদা শ্রেণিতে রাখা হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আরও গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। এজন্য তারা ‘ডেথ রিভিউ’ বা মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনার ওপর জোর দিচ্ছেন।

করোনাভাইরাস ও ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে যেমন মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, এবারও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনের কারণ, টিকাগ্রহণের অবস্থা, অপুষ্টি, চিকিৎসা পাওয়া না পাওয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে ভবিষ্যতে এমন মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। এদিকে চলতি বছরের শুরুতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ একাধিক এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। মার্চে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে স্বাস্থ্য বিভাগ বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।বস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।পাশাপাশি সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬১ হাজারেরও বেশি শিশু।সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট অঞ্চল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, বিশেষ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা এবং কিছু এলাকায় টিকার সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়। এর ফলেই হামের এই বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকাদান নয়, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ও কারণ নির্ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বজনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো সর্বোচ্চ ঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় সতর্কতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং টিকাদান জোরদার না হলে সংক্রমণ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।বতাদের মতে, হামে মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র জানতে হলে ‘নিশ্চিত’ ও ‘সন্দেহজনক’ বিভাজনের বাইরে গিয়ে প্রতিটি মৃত্যুর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি। কারণ প্রকৃত তথ্যই ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যনীতি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, বাধা দিতে গিয়ে পিছু হটল পুলিশ

হামে মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালেও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক, স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ বলছেন বিশেষজ্ঞরা

আপডেট সময় : ১০:৩৪:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশু মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৬০৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, সরকার যে তথ্য প্রকাশ করছে তা প্রকৃত পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে না। বিশেষ করে ‘সন্দেহজনক হামে মৃত্যু’ নামে আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশকে তারা বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৫ জুন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯১ শিশু। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৫১৪ জনের। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশই ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্তমানে দেশে যেভাবে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে হামের উপসর্গ থাকা অধিকাংশ মৃত্যুকেই হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। জাতীয় টিকাদান ও কারিগরি পরামর্শক দলের সদস্য এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মহামারী পরিস্থিতিতে শুধু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা ধরে মৃত্যুর হিসাব করলে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাদের মতে, হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুবরণ করা শিশুদের অধিকাংশই কার্যত হামের কারণেই প্রাণ হারাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের একজন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেসব শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়ে মৃত্যু ঘটছে, তাদের আলাদা করে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করার যৌক্তিকতা নেই। কারণ বাস্তবতা বিবেচনায় এসব মৃত্যুও হামের সঙ্গেই সম্পর্কিত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘সন্দেহজনক’ শব্দটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তিনি মনে করেন, অন্তত ‘সম্ভাব্য হামজনিত মৃত্যু’ হিসেবে এসব ঘটনা উল্লেখ করা উচিত ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য তাদের অবস্থানে অনড়। সংস্থাটির দাবি, পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া রোগীদের মৃত্যুকেই ‘নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অন্য জটিলতায় মারা যাচ্ছে, তাদের আলাদা শ্রেণিতে রাখা হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আরও গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। এজন্য তারা ‘ডেথ রিভিউ’ বা মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনার ওপর জোর দিচ্ছেন।

করোনাভাইরাস ও ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে যেমন মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, এবারও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনের কারণ, টিকাগ্রহণের অবস্থা, অপুষ্টি, চিকিৎসা পাওয়া না পাওয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে ভবিষ্যতে এমন মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। এদিকে চলতি বছরের শুরুতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ একাধিক এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। মার্চে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে স্বাস্থ্য বিভাগ বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।বস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।পাশাপাশি সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬১ হাজারেরও বেশি শিশু।সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট অঞ্চল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, বিশেষ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা এবং কিছু এলাকায় টিকার সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়। এর ফলেই হামের এই বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকাদান নয়, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ও কারণ নির্ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বজনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো সর্বোচ্চ ঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় সতর্কতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং টিকাদান জোরদার না হলে সংক্রমণ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।বতাদের মতে, হামে মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র জানতে হলে ‘নিশ্চিত’ ও ‘সন্দেহজনক’ বিভাজনের বাইরে গিয়ে প্রতিটি মৃত্যুর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি। কারণ প্রকৃত তথ্যই ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যনীতি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।