আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তার জগতে ড. মুহাম্মদ উমর চাপরা ছিলেন এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। গত ১৩ জুন তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তিনি প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কেবল প্রবৃদ্ধি ও সংখ্যার নিরিখে বিচার করেননি, বরং অর্থনীতির সঙ্গে নৈতিকতা, মানবকল্যাণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের গভীর সংযোগকে তাঁর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলেন। প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি তাঁর গবেষণা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই মৌলিক সত্যটি তুলে ধরেছেন যে, সুদের ওপর নির্মিত একটি আর্থিক কাঠামো, যা সমাজের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হয়, শেষ পর্যন্ত তা সমাজের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করে।
তাঁর উপলব্ধি ছিল, নৈতিকতাহীন একটি অর্থব্যবস্থা মানুষের কল্যাণের হাতিয়ার না হয়ে সম্পদ ও সুযোগের একমুখী প্রবাহের যন্ত্রে পরিণত হয়। এর ফলে সম্পদ সীমিত কিছু ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত হয় এবং বৃহত্তর সমাজ বঞ্চিত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকটকে দেখলে মনে হয়, ড. চাপরা বহু আগেই এই সংকটের মূল কারণগুলো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।
ড. চাপরা ১৯৩৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার করাচিতে চলে যায়। তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি সৌদি অ্যারাবিয়ান মনিটারি এজেন্সিতে (সামা) যোগদান করেন এবং সেখানে প্রায় ৩৫ বছর ধরে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সামা থেকে অবসরের পর তিনি ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের অধীনে ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (আইআরটিআই) গবেষণা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।
সমকালীন ইসলামি অর্থনীতিকে একটি ফলিত শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করায় ড. চাপরার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। যে সময়ে ইসলামি অর্থায়ন মূলত সুদ-নিষেধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তখন তিনি ইসলামি অর্থব্যবস্থার প্রকৃত উদ্দেশ্য ‘মাকাসিদ আশ-শরিয়াহ’ অর্থাৎ ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ, সামাজিক সংহতি ও ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, যেকোনো অর্থব্যবস্থার মূল্যায়ন কেবল সম্পদ সৃষ্টির সক্ষমতায় নয়, বরং দারিদ্র্য হ্রাস, পরিবার ও সমাজকে শক্তিশালী করা এবং সুযোগের সমবণ্টনের ওপর নির্ভর করে।
রিপোর্টারের নাম 

























