দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, কটূক্তি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আসছেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাদিয়া জাহান প্রভা। এতদিন বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা না বললেও এবার নীরবতা ভেঙেছেন তিনি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় অনলাইন হয়রানি, ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতি এবং সাইবার অপরাধীদের প্রতি সমাজের নরম অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই অভিনেত্রী।

ভিডিওর শুরুতেই প্রভা জানান, দীর্ঘদিন তিনি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাননি। কারণ তার মনে হয়েছিল, কথা বলেও কোনো পরিবর্তন আসে না। তবে নিজের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তিনি মনে করেছেন, কিছু বিষয় নিয়ে আর চুপ থাকা সম্ভব নয়।

প্রভা বলেন, “আমি এখন কিছু জ্বালাময়ী সত্যি কথা বলব। অনেকদিন ধরে সাম্প্রতিক নানা ঘটনা নিয়ে কথা বলিনি। ভেবেছিলাম, কথা বলেও তো কোনো লাভ নেই। কিন্তু কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর দিকে চোখ বন্ধ করে থাকা যায় না।”

সাইবার বুলিংকারীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, মানুষের নিজের যোগ্যতা, অবস্থান, সৌন্দর্য কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে অনিরাপত্তাবোধ থেকেই অনেক সময় অন্যকে হেয় করার প্রবণতা তৈরি হয়। তিনি উল্লেখ করেন, এটি তার ব্যক্তিগত মত নয়; বরং মনোবিজ্ঞান ও মানব আচরণবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

তার ভাষায়, “যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের নিয়ে আগ্রাসীভাবে বিচার করে, ট্রল করে কিংবা মৌখিকভাবে অপমান করে, তারা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। প্রত্যেক মানুষেরই কোনো না কোনো দুঃখ থাকে। কিন্তু যারা নিজেদের দুর্বলতা বা অনিরাপত্তা মেনে নিতে পারে না, তারাই বেশি অন্যকে আক্রমণ করে।”

প্রভা বলেন, তার জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে অনলাইন ট্রল ও অপমানের মধ্য দিয়ে। গত ১৬ বছরে তাকে নিয়ে অসংখ্য কটূক্তি, বিদ্রূপ ও নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সমাজ অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীকেই বেশি আক্রমণ করে।

“আমাকে নিয়ে যারা ট্রল করেন, তারা হয়তো এতে আনন্দ পান। আমি সেটা বুঝি। কিন্তু যতটা সময় ও শক্তি আমাকে নিয়ে ব্যয় করা হয়েছে, তার অর্ধেকও যদি প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যয় করা হতো, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত,” বলেন তিনি।

ভিডিও বার্তায় তিনি আরও বলেন, কোনো মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা একটি গুরুতর অপরাধ। কিন্তু সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয় এবং বছরের পর বছর তাকে অপমানের শিকার হতে হয়।

প্রভা বলেন, “যারা অন্যের ক্ষতি করে, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করে, তারা অপরাধী। অথচ তাদের নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। বরং দিনের পর দিন ভিকটিমকে নিয়ে হাসাহাসি, ট্রল আর অপমান করা হয়।”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সমাজ যদি অপরাধীদের পরিচয় প্রকাশ ও তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় আরও সোচ্চার হতো, তাহলে অনেক অপরাধ হয়তো ঘটতই না।

ভিডিও বার্তার শেষাংশে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান প্রভা। তিনি মনে করেন, অনলাইন হয়রানিকে বিনোদন হিসেবে না দেখে সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সংস্কৃতি গড়ে তোলারও আহ্বান জানান এই অভিনেত্রী।

প্রভার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তার সাহসী অবস্থানের প্রশংসা করছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন।
রিপোর্টারের নাম 

























