১৭৯৩ সালের ভূমি রাজস্ব আইনে প্রবর্তিত ‘সূর্যাস্ত আইন’ ঔপনিবেশিক বাংলায় জমিদার প্রথায় এক নির্মম পরিবর্তন এনেছিল। এই কঠোর বিধানের মাধ্যমে ইংরেজরা পুরোনো জমিদারদের উচ্ছেদ করে নিজেদের অনুগত নতুন জমিদারশ্রেণি তৈরি করে, যা গ্রামবাংলার সামাজিক কাঠামোতে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘বহিপীর’ নাটকে হাতেম আলীর চরিত্রের মাধ্যমে এই আইনের নেতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে।
সূর্যাস্ত আইনের পাশাপাশি ‘লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত আইন’ জারি করা হয়। এই দুই আইনের অপব্যবহারের ফলে বিশেষত মুসলমানদের জমিদারি, তালুকদারি এবং লাখেরাজ সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয় এবং তা ইংরেজদের অনুগতদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। খ্রিষ্টান পাদরি এবং ব্রাহ্মণ-কায়স্থদের পরামর্শে ঔপনিবেশিক শাসকরা হঠাৎ করে পুরনো লাখেরাজ ও আয়মা সম্পত্তির দলিল-দস্তাবেজ দাখিলের নির্দেশ জারি করেন। এই আকস্মিক নির্দেশে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দলিল দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, যা অনেক মুসলমানের পক্ষে পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে মুসলমানদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ লাখেরাজ সম্পত্তি এবং তাদের জমিদারি খাস করে নেওয়া হয়। সূর্যাস্তের পর এসব সম্পত্তি ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, এবং অনেক হিন্দু নায়েব-গোমস্তাও রাতারাতি জমিদার বনে যান।
ইংরেজরা লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত আইনের মাধ্যমে মুসলিম আমলের বিভিন্ন ধরনের জায়গির, আয়মা, লাখেরাজ, আলতমগা, মদতে মায়াশ প্রভৃতি ভূসম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। এর ফলে মুসলমানদের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ১৮১৬ সাল থেকে হাজী মুহাম্মদ মুহসিনের ওয়াকফ তহবিলের বার্ষিক ৫৫ হাজার টাকা আয়সহ ২২ লাখ টাকার তহবিল এবং চট্টগ্রামের মীর আবদুর রহীমের ওয়াকফ তহবিলসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তহবিল অন্যায়ভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৮২৮ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে ২০ হাজারের বেশি লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে, যা মুসলমানদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
রিপোর্টারের নাম 























