ঢাকা ০৭:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

অক্টোবরে শুরু হতে পারে স্থানীয় নির্বাচন, সেনা মোতায়েনের পক্ষে নয় ইসি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের অংশগ্রহণে একাধিক অভ্যন্তরীণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে নির্বাচনী আইন, আচরণবিধি, বিধিমালা সংশোধনের পাশাপাশি কবে থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা যেতে পারে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিশনের অধিকাংশ সদস্য চলতি বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে নির্বাচন শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন।

যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি, তবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সেপ্টেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে, বর্ষাকাল ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সেপ্টেম্বরকে উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

নির্বাচন কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ করে হাওর ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে নির্বাচন আয়োজন কঠিন হতে পারে। সে কারণেই অক্টোবরের শেষ সপ্তাহকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কোনো কারণে সেটি সম্ভব না হলে নভেম্বরের শুরুতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার Abdur Rahmanel Masud জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা থাকলেও বর্ষাকালে দেশের অনেক এলাকায় ভোটগ্রহণ কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই বছরের শেষভাগে নির্বাচন শুরুর ব্যাপারে কমিশন ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা। অতীতে স্থানীয় নির্বাচনে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এবার ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে নয় নির্বাচন কমিশন। কমিশনের অভ্যন্তরীণ বৈঠকগুলোতে এ বিষয়ে স্পষ্ট মতামত উঠে এসেছে।

নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হলো, স্থানীয় সরকার নির্বাচন একযোগে নয়, ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে। ফলে প্রতিটি ধাপে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তাই সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা তারা দেখছে না।

তবে এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক Badiul Alam Majumdar। তার মতে, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে সহিংসতা ও রক্তপাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক উপদেষ্টা M Sakhawat Hossain মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হলে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।

কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে, সে বিষয়েও কমিশনের আলোচনা চলছে। দেশে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, কোন নির্বাচন আগে হবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তনও আসতে পারে। বিশেষ করে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ এবং নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে কমিশন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন পদে প্রার্থীদের জন্য নতুন জামানত নির্ধারণের চিন্তাভাবনা চলছে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের জন্য জামানত দেড় লাখ টাকা, কাউন্সিলরদের জন্য এক লাখ টাকা, পৌরসভার মেয়র প্রার্থীদের জন্য এক লাখ টাকা এবং কাউন্সিলরদের জন্য ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। একইসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং সদস্য প্রার্থীদের জন্য এক হাজার টাকা জামানত নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় প্রতীকে আয়োজনের লক্ষ্যে সংশোধিত আইন পাস হয়। এরপর থেকেই নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধি সংশোধনের কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহও সম্পন্ন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ বিরতির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নতুন গতি পেয়েছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পরই নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সুন্দরবনে বাড়ছে হরিণ শিকার, সক্রিয় শতাধিক চক্র; ফাঁদে পড়ছে বাঘও

অক্টোবরে শুরু হতে পারে স্থানীয় নির্বাচন, সেনা মোতায়েনের পক্ষে নয় ইসি

আপডেট সময় : ০৫:৫৮:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের অংশগ্রহণে একাধিক অভ্যন্তরীণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে নির্বাচনী আইন, আচরণবিধি, বিধিমালা সংশোধনের পাশাপাশি কবে থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা যেতে পারে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিশনের অধিকাংশ সদস্য চলতি বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে নির্বাচন শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন।

যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি, তবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সেপ্টেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে, বর্ষাকাল ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সেপ্টেম্বরকে উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

নির্বাচন কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ করে হাওর ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে নির্বাচন আয়োজন কঠিন হতে পারে। সে কারণেই অক্টোবরের শেষ সপ্তাহকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কোনো কারণে সেটি সম্ভব না হলে নভেম্বরের শুরুতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার Abdur Rahmanel Masud জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা থাকলেও বর্ষাকালে দেশের অনেক এলাকায় ভোটগ্রহণ কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই বছরের শেষভাগে নির্বাচন শুরুর ব্যাপারে কমিশন ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা। অতীতে স্থানীয় নির্বাচনে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এবার ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে নয় নির্বাচন কমিশন। কমিশনের অভ্যন্তরীণ বৈঠকগুলোতে এ বিষয়ে স্পষ্ট মতামত উঠে এসেছে।

নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হলো, স্থানীয় সরকার নির্বাচন একযোগে নয়, ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে। ফলে প্রতিটি ধাপে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তাই সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা তারা দেখছে না।

তবে এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক Badiul Alam Majumdar। তার মতে, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে সহিংসতা ও রক্তপাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক উপদেষ্টা M Sakhawat Hossain মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হলে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।

কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে, সে বিষয়েও কমিশনের আলোচনা চলছে। দেশে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, কোন নির্বাচন আগে হবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তনও আসতে পারে। বিশেষ করে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ এবং নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে কমিশন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন পদে প্রার্থীদের জন্য নতুন জামানত নির্ধারণের চিন্তাভাবনা চলছে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের জন্য জামানত দেড় লাখ টাকা, কাউন্সিলরদের জন্য এক লাখ টাকা, পৌরসভার মেয়র প্রার্থীদের জন্য এক লাখ টাকা এবং কাউন্সিলরদের জন্য ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। একইসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং সদস্য প্রার্থীদের জন্য এক হাজার টাকা জামানত নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় প্রতীকে আয়োজনের লক্ষ্যে সংশোধিত আইন পাস হয়। এরপর থেকেই নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধি সংশোধনের কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহও সম্পন্ন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ বিরতির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নতুন গতি পেয়েছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পরই নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে।