কৃষি খাতের কাঠামোগত বঞ্চনা দূর করতে এবং সরকারি সব সুবিধা সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আগামী ৪ বছরের মধ্যে দেশের ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হবে ‘কৃষক কার্ড’। কৃষি, মৎস্য ও ডেইরি খাতের সঙ্গে যুক্ত সবাই এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
কৃষিসংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে আগামী পয়লা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল) এই মেগা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। প্রাথমিকভাবে চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮১ কোটি টাকা।
কৃষক কার্ডে মিলবে যে ১০ সুবিধা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এই একটি কার্ডের মাধ্যমেই কৃষকরা প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। কৃষকের অন্যান্য ভাতা প্রাপ্তির কোনো কার্ড থাকলে সেটিও এই কার্ডের অধীনে চলে আসবে। সুবিধাগুলো হলো:
- ন্যায্যমূল্যে সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ
- সরকারি ভর্তুকি ও আর্থিক প্রণোদনা
- ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা
- সহজ শর্তে কৃষিঋণ
- কৃষি বিমাসুবিধা
- ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের নিশ্চয়তা
- আধুনিক কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ
- আবহাওয়া বিষয়ক আগাম তথ্য
- রোগবালাই দমনে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
- জমির পরিমাণ অনুযায়ী সারের কোটা নির্ধারণ (যাতে অতিরিক্ত সারের ব্যবহার রোধ করা যায়)
কারা ও কীভাবে পাবেন এই কার্ড?
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, কৃষকদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ভর্তুকি ও প্রণোদনার টাকা যেন সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছায় এবং তা কৃষিখাতেই ব্যয় হয়, সেটি নিশ্চিত করতে প্রত্যেক কৃষকের নামে সোনালী ব্যাংকে হিসাব (অ্যাকাউন্ট) খোলা হবে। এই স্মার্ট কৃষক কার্ডে একজন কৃষকের ৪৫ ধরনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।
প্রথম ধাপে ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে এই সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে:
১. ভূমিহীন: ৫ শতাংশের কম জমির মালিক।
২. প্রান্তিক: ৫ থেকে ৪৯ শতাংশ জমির মালিক।
৩. ক্ষুদ্র: ৫০ থেকে ২৪৯ শতাংশ জমির মালিক।
৪. মাঝারি কৃষক।
৫. সচ্ছল কৃষক।
চলছে পাইলট প্রকল্পের কাজ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের ১০টি উপজেলার ১০টি কৃষি ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষকদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে, যা এপ্রিলের মধ্যে শেষ হবে। এরপর ১৫টি উপজেলার সব কৃষককে নিয়ে কার্ডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “সরকারি প্রণোদনা, ভাতা ও ভর্তুকি কৃষকের জন্য সহজলভ্য করতে এই কার্ড যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।”
নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম মূল অঙ্গীকার ছিল এই কৃষক কার্ড। কৃষির আধুনিকায়ন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার কাজ করছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করে সরকার, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মত: ‘উদ্যোগটি চমৎকার, তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে’
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কিছু চ্যালেঞ্জের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করা। তালিকা হালনাগাদ না থাকলে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা হাতিয়ে নিতে পারে।”
উদ্যোগটি সফল করতে তিনি সরকারকে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
- প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করে একটি নির্ভুল ও ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা।
- ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা।
- সার, ডিজেল ও অন্যান্য ভর্তুকি বিতরণে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
রিপোর্টারের নাম 

























