রাজধানীতে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং রফতানিতে মন্থরতার কারণে অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দ্রুত ও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) ও ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা: নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, তবে পুনরুদ্ধারের আভাস
ফাহমিদা খাতুন জানান, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে তিন দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শিল্প ও সেবা খাতে গতি কমে যাওয়া এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এ পতনের বড় কারণ। তবে, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে চার দশমিক ৫০ শতাংশে উঠেছে। এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও, তা এখনও স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি সীমিত
উচ্চ মূল্যস্ফীতি গত দুই বছরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ অর্থবছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক সাত শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে আট দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে।
কিন্তু, একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির রয়েছে। ফলে প্রকৃত আয় বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মূল্যস্ফীতি কমলেই হবে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণপ্রবাহে নিম্নগতি
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নেমে এসেছে ছয় দশমিক ১০ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে বোঝা যায়, উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন। উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বাজারে আস্থার ঘাটতি এ পরিস্থিতির পেছনে কাজ করছে।
অন্যদিকে, সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় সরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩২ দশমিক ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজস্ব দুর্বল, ঋণের চাপ বাড়ছে
২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতও কমে ৭ দশমিক ৮১ শতাংশে নেমেছে। এতে সরকারের ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও ২০২৬ অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে মত দেন বক্তারা।
ব্যাংক খাতে ঝুঁকি এখনও বড়
ব্যাংকিং খাতে কিছু তারল্য সূচকে উন্নতি হলেও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ পদ্ধতি চালুর পর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছুটা কমলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না বলে সতর্ক করা হয়।
রফতানিতে ভাটা, রেমিট্যান্সে ভরসা
২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রফতানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এক দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। তৈরি পোশাক খাতে মন্থরতা এর প্রধান কারণ। তবে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়ে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ জোরদার করতে পারে।
সামনে এলডিসি উত্তরণ
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে বাজার সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই রফতানি বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নত করা এখন সময়ের দাবি।
সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং এলডিসি-পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাদের মতে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক আভাস থাকলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনও নাজুক। তাই ঘুরে দাঁড়াতে হলে বড় ও গভীর সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
রিপোর্টারের নাম 























