ঢাকা ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

নির্মল বায়ুর শহর এখন দূষণের নগরী, নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি

রাজশাহী সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে নাগরিক সেবা পেতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি (মেয়র ও কাউন্সিলর) না থাকায় প্রশাসনিক স্থবিরতা ও সেবা কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের অর্ধেকের বেশি সড়ক কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা। অনুমোদনহীন দ্বিগুণ যানবাহন চলাচলে তীব্র যানজট। এসব নিয়ে নগরীর বাসিন্দাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।

নগরীর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০ লাখ জন-অধ্যুষিত রাজশাহী মহানগরী ছিল দেশের সবচেয়ে স্মার্ট সিটিগুলোর একটি। গ্রিনসিটি খ্যাত এ মহানগরী এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মেয়র-কাউন্সিলর না থাকায় সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে চরম হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরীবাসী।

সনদ সংগ্রহে জটিলতা

জন্ম ও মৃত্যু সনদ, নাগরিকত্ব সনদ এবং উত্তরাধিকারী সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নগরবাসীকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।

পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন

নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার ও মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।

উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির

অনেক পুরনো প্রকল্পের কাজ থমকে আছে এবং নতুন কোনো বড় প্রকল্প শুরু না হওয়ায় অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসিক বর্তমানে তারল্য সংকটে ভুগছে, যার ফলে অনেক মাস্টার-রোল কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে এবং বাজার তদারকি বা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতো রুটিন সেবাগুলো বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে।

ধুলাময় শহর, খানাখন্দে ভরা সড়কে ভোগান্তি

সবুজ নগরী রাজশাহীতে বেড়েছে বায়ু ও শব্দদূষণ। খানাখন্দে ভরা সড়ক। অপরিচ্ছন্নতার ছড়াছড়ি। ধুলাময় চারপাশ। ফুটপাত মানুষের দখলে। সড়কে তীব্র যানজট। সড়ক বিভাজকের গাছগুলো নিষ্প্রাণ। চারদিকে যানবাহনের উচ্চশব্দ। দুই বছর আগেও যে শহর নির্মল বায়ু ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত পেয়েছিল, তার বর্তমান চিত্র এমন। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসকের অভাব এবং সমন্বয়হীনতার কারণে এমনটি ঘটেছে বলে মনে করছেন নগরবাসী ও সংশ্লিষ্টরা। নগরীকে এখন বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও খানাখন্দে ভরা সড়ক এবং অপরিচ্ছনতার শহর হিসেবেই দেখছেন সবাই।

নগরের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটার পর একটা ভুল পরিকল্পনা শহরের সুনাম ও সৌন্দর্য ম্লান করে দিয়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে নির্মল বায়ুর শহরকে দূষিত বায়ুর শহরে পরিণত করা হয়েছে। বছরজুড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাচীন গাছ কাটা হয়েছে। একের পর এক পুকুর জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। কোনও নিয়মনীতি না মেনেই শহরে অটোরিকশা বাড়তে দেওয়া হয়েছে, বাস মালিক সমিতির দৌরাত্ম্যে শহরের ভেতর থেকে বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হয়নি। ফলে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। জনবল ছাঁটাই করায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছিল।

দেড় বছরে সড়কগুলো সংস্কার হয়নি

নগরীর মধ্যে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সব সড়ক এখন খানাখন্দে ভরা। ফলে প্রায় ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। গত দেড় বছরে সড়কগুলো সংস্কার করা হয়নি। এ কারণে অনেক জায়গায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। আবার গত কয়েক বছর ধরে চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করায় বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং সড়কের পাশে নিমার্ণসামগ্রী রাখায় যানজট তৈরি হচ্ছে। ফ্লাইওভার নির্মাণাধীন এলাকায় এত বেশি ধুলা যে, ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী মানুষজন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণে এবং অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল; বিশেষ করে মূল সড়কগুলোতে রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করায় তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন।

শব্দদূষণ ও খানাখন্দে ভরা সড়ক এবং অপরিচ্ছনতার শহর হিসেবেই দেখছেন সবাইশব্দদূষণ ও খানাখন্দে ভরা সড়ক এবং অপরিচ্ছনতার শহর হিসেবেই দেখছেন সবাই

তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন বলেন, ‘সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে তালাইমারী থেকে ভদ্রা হয়ে শিরোইল বাস টার্মিনাল পর্যন্ত সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজগুলোও দ্রুত শুরু হবে। এ ছাড়া আগামী জুন মাসের মধ্যে তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ সম্পন্ন হবে। অন্য আরেকটি ফ্লাইওভারের কাজও দ্রুত শেষ হবে। তাহলে আর জনভোগান্তি থাকবে না।’

ময়লা-আবর্জনার স্তূপ

শহরজুড়ে আধুনিক চওড়া সড়ক ব্যবস্থা থাকায় ফুটপাতে আরামে হেঁটে চলা যেতো। ফুটপাত ও সড়ক বিভাজকে ঋতুভেদে রোপিত বিভিন্ন জাতের ফুলের সৌন্দর্য নগরবাসীকে মোহিত করতো। একসময় নির্মল বায়ুর শহর হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিল। আলোক বাতির কারণে রাতের শহর মুগ্ধ করতো সবাইকে। শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পদ্মার পাড় থেকে নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখা যেতো। টি-বাঁধ ও আই-বাঁধসহ কয়েকটা স্পট বিনোদনপ্রেমীদের কাছে ছিল অন্যতম। কিন্তু এখন সে অবস্থা আর নেই। সড়ক ও নদীর পাশে রাখা হয় ময়লা-আবর্জনা। প্রধান সড়কগুলো নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া হলেও পদ্মা তীরবর্তী ফুটপাতে আবর্জনা জমে স্তূপ হয়েছে। সেগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। সিটি হাট এলাকায় পরিশোধন ছাড়াই ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। যা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে কৃষিজমি ও নদীতে গিয়ে মিশছে। নগরীর বেশিরভাগ ড্রেন অপরিষ্কার। যেসব ড্রেন পরিষ্কার করা হয়, সেসব ময়লা-আবর্জনা ড্রেন থেকে তোলার পর সড়কের ওপর দীর্ঘদিন রেখে দেওয়া হয়। যা থেকে জীবাণু ছড়ায়। বর্তমানে ফুটপাত অনেকটাই দখলে। আবার অনেক স্থানে ফুটপাতের ঢাকনাও চুরি হয়ে গেছে। যা উন্মুক্ত পথে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারী।

এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, ‘আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন ভ্যানগাড়ি দিয়ে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে। প্রতিদিন রাতে ও দিনে সড়ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। সেসব ময়লা জমা হয় নগরীর ১৭টি পয়েন্টে রাখা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে। সেখান থেকে রাতে ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে সিটি হাট এলাকায় ডাম্পিং করা হয়। বর্তমানে ১ হাজার ২৬৫ পরিচ্ছন্নতাকর্মী এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। প্রতিদিন বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ, রাস্তাঘাট ও ফুটপাত থেকে ৩৫০ থেকে ৪০০ মেট্রিক বর্জ্য উৎপাদন হয়। সেগুলো সিটি হাট এলাকায় ডাম্পিং করা হয়।’

এক লাইসেন্সে চলে একাধিক রিকশা-অটোরিকশা, যানজটে ভোগান্তি

শহরে চলাচলের জন্য সিটি করপোরেশন থেকে ৮ হাজার ৯৭০টি অটোরিকশা ও ৫ হাজার ৮১৯টি রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এখন শহরে চলছে ২৫ হাজারের বেশি। যা তীব্র যানজট তৈরি করছে। এক লাইসেন্সে একাধিক রিকশা ও অটোরিকশা চলছে। এসব বন্ধে সিটি করপোরেশন থেকে কার্যত কোনও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। 

ফ্লাইওভার নির্মাণে ধীরগতিতে যানজট

শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর চারটি পয়েন্টে ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য যানজট বেড়েছে। বিশেষ করে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বহরমপুর-বিলসিমলা, বন্ধ গেট ও রেলগেট এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে এই এলাকায় যানবাহন চলাচল সীমিত করায় নগরীতে যানজট বেড়েছে। আবার শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান শিরোইল থেকে বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে না নেওয়ায় বাসে যাত্রী ওঠানামার কারণেও যানজট তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া ভদ্রা মোড়েও অসস্থায়ীভাবে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল যাত্রী ওঠানামা করার কারণেও যানজট দেখা দিচ্ছে।

ফুটপাত দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানফুটপাত দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

নিয়মিত কর দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত কর দিলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছি না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এমনটি হচ্ছে। শহরের কোথাও শৃঙ্খলা নেই। একটি লাইসেন্সে ১০টি গাড়ি চলে। তৈরি হচ্ছে যানজট। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং যততত্র ময়লা ফেলে অপরিচ্ছন্ন নগরী বানানো হয়েছে। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। ঠিকভাবে শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে না। যানবাহনে শৃঙ্খলা নেই। ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মশার উপদ্রব বেড়েছে। নির্মাণকাজ চলায় যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রাখা হচ্ছে। এজন্য বায়ুদূষণ বাড়ছে। অর্থাৎ রাজশাহীকে যে গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি ও হেলদি সিটি বলা হতো, তার সবই হ্রাস পাচ্ছে। দ্রুত এসব বিষয়ে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।’

নগরীতে বসবাস করেও বস্তিবাসী সেবা থেকে বঞ্চিত

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ-বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী নৃবিজ্ঞানী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘একটি আধুনিক শহর তাকেই বলা যায়, যার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক। রাজশাহী সিটির বর্জ্য ফেলা হয় নদীতে। যা কৃষিজমিতে মিশে কৃষি ব্যবস্থাপনা ধ্বংস করছে। নগরীতে বসবাস করেও বস্তিবাসী সিটি করপোরেশনের সেবা থেকে বঞ্চিত। বেশিরভাগ বস্তিতে নেই বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। আবাসন ব্যবস্থাও নেই তাদের জন্য। এসব বিষয়ে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।’

ট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজনের) রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন, ‘রাজশাহীতে বড় বড় রাস্তা রয়েছে। কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর। যেখানে সেখানে গাড়ি থামায়, ট্রাফিক সিগন্যাল নাই। অটোরিকশার আধিক্যে চলাচল করা মুশকিল। এর মধ্যে আবার সিএনজি স্ট্যান্ড শহরের ভেতরে। নওদাপাড়া এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার পরও শিরোইল ও ভদ্রা এলাকা থেকে বাসস্ট্যান্ড সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে রাস্তাগুলোতে তীব্র যানজট লেগে থাকে। রেলগেট, শিরোইল ও ভদ্রা এলাকার সড়কগুলো ক্রমে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। এজন্য বাসস্ট্যান্ড ও সিএনজি স্ট্যান্ড শহর থেকে সরিয়ে নওদাপাড়ায় নেওয়া উচিত।’

কমাতে হবে শব্দ ও বায়ুদূষণ

রাজশাহীর বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন খান বলেন, ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যানবাহনগুলো বিশেষ করে রিকশা ও অটোরিকশা যাতে টিটি হর্ন ব্যবহার না করে যাতে ভেপু হর্ন ব্যবহার করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ ভেপু হর্নের ফ্রিকোয়েন্সি আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকে। টিটি হর্নের ফ্রিকোয়েন্সি দূরে ছড়িয়ে পড়ে। সাহেব বাজার, লক্ষ্মীপুর ও রেলগেট এলাকায় যাতে পরিবহনে যাত্রী উঠাতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় গাছ লাগানোর পাশাপাশি বায়ুদূষণ নীতিমালায় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের নীতি অনুসরণ করলে অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’

ট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুরট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর

গাছ লাগানোর বিকল্প নেই

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্যাহ আল মারুফ বলেন, ‘বড় গাছ যে পরিমাণ ছায়া ও আরাম দিতে পারে তা ছোট গাছ দিতে পারে না। নির্মল বায়ু পেতে অবশ্যই বড় গাছ লাগাতে হবে। আবার বড় গাছের অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। অথচ রাজশাহীতে ১৯৯৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ শতাংশ সবুজায়ন কমেছে। এটা হতাশার কথা। কাজেই গাছ লাগানোর বিকল্প নেই।’

রাজশাহী সচেতন নাগরিক সমাজের তরিকুল কালাম স্বপন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে নাগরিক সেবার অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। জন্ম নিবন্ধন, নাগরিক ও মৃত্যু সনদপত্র পেতে ভোগান্তি বেড়েছে। নতুন হোল্ডিং খোলার জন্য সেবাগ্রহীতা সিটি করপোরেশনে গেলে কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়ছেন। ভবন নির্মাণে এনওসি পেতে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ছাড়পত্র পেতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন করে খুলতে গেলেও ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের অলিগলিতে বৈদ্যুতিক ল্যাম্পপোস্টগুলোতে মাসের পর মাস লাইট না থাকলেও সে বিষয়ে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। বিভিন্ন ধরনের ভাতা পেতেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ভাতাভোগীদের।’

নগরের একাধিক বাসিন্দা জানান, নগরের প্রধান হিসেবে একজন জনপ্রতিনিধি না থাকায় পদে পদে নানা জটিলতার শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। দীর্ঘ ১৯ মাস ধরে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের এই অচল অবস্থা নিরসনের জন্য নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক চান তারা। 

প্রসঙ্গত, ঢাকা উত্তর, দক্ষিণসহ দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে ছয় জন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখনও বাকি রয়েছে আরও ছয়টি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ। এর মধ্যে অন্যতম রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। প্রশাসক নিয়োগকে ঘিরে দলীয় অঙ্গনে শুরু হয়েছে তৎপরতা। অন্তত হাফ ডজন বিএনপি নেতা প্রশাসক হওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন। যারা ইতোমধ্যে দলের হাই কমান্ডে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি তিন জনের নাম শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে দুজন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্মল বায়ুর শহর এখন দূষণের নগরী, নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি

আপডেট সময় : ১০:১১:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

রাজশাহী সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে নাগরিক সেবা পেতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি (মেয়র ও কাউন্সিলর) না থাকায় প্রশাসনিক স্থবিরতা ও সেবা কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের অর্ধেকের বেশি সড়ক কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা। অনুমোদনহীন দ্বিগুণ যানবাহন চলাচলে তীব্র যানজট। এসব নিয়ে নগরীর বাসিন্দাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।

নগরীর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০ লাখ জন-অধ্যুষিত রাজশাহী মহানগরী ছিল দেশের সবচেয়ে স্মার্ট সিটিগুলোর একটি। গ্রিনসিটি খ্যাত এ মহানগরী এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মেয়র-কাউন্সিলর না থাকায় সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে চরম হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরীবাসী।

সনদ সংগ্রহে জটিলতা

জন্ম ও মৃত্যু সনদ, নাগরিকত্ব সনদ এবং উত্তরাধিকারী সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নগরবাসীকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।

পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন

নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার ও মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।

উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির

অনেক পুরনো প্রকল্পের কাজ থমকে আছে এবং নতুন কোনো বড় প্রকল্প শুরু না হওয়ায় অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসিক বর্তমানে তারল্য সংকটে ভুগছে, যার ফলে অনেক মাস্টার-রোল কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে এবং বাজার তদারকি বা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতো রুটিন সেবাগুলো বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে।

ধুলাময় শহর, খানাখন্দে ভরা সড়কে ভোগান্তি

সবুজ নগরী রাজশাহীতে বেড়েছে বায়ু ও শব্দদূষণ। খানাখন্দে ভরা সড়ক। অপরিচ্ছন্নতার ছড়াছড়ি। ধুলাময় চারপাশ। ফুটপাত মানুষের দখলে। সড়কে তীব্র যানজট। সড়ক বিভাজকের গাছগুলো নিষ্প্রাণ। চারদিকে যানবাহনের উচ্চশব্দ। দুই বছর আগেও যে শহর নির্মল বায়ু ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত পেয়েছিল, তার বর্তমান চিত্র এমন। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসকের অভাব এবং সমন্বয়হীনতার কারণে এমনটি ঘটেছে বলে মনে করছেন নগরবাসী ও সংশ্লিষ্টরা। নগরীকে এখন বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও খানাখন্দে ভরা সড়ক এবং অপরিচ্ছনতার শহর হিসেবেই দেখছেন সবাই।

নগরের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটার পর একটা ভুল পরিকল্পনা শহরের সুনাম ও সৌন্দর্য ম্লান করে দিয়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে নির্মল বায়ুর শহরকে দূষিত বায়ুর শহরে পরিণত করা হয়েছে। বছরজুড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাচীন গাছ কাটা হয়েছে। একের পর এক পুকুর জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। কোনও নিয়মনীতি না মেনেই শহরে অটোরিকশা বাড়তে দেওয়া হয়েছে, বাস মালিক সমিতির দৌরাত্ম্যে শহরের ভেতর থেকে বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হয়নি। ফলে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। জনবল ছাঁটাই করায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছিল।

দেড় বছরে সড়কগুলো সংস্কার হয়নি

নগরীর মধ্যে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সব সড়ক এখন খানাখন্দে ভরা। ফলে প্রায় ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। গত দেড় বছরে সড়কগুলো সংস্কার করা হয়নি। এ কারণে অনেক জায়গায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। আবার গত কয়েক বছর ধরে চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করায় বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং সড়কের পাশে নিমার্ণসামগ্রী রাখায় যানজট তৈরি হচ্ছে। ফ্লাইওভার নির্মাণাধীন এলাকায় এত বেশি ধুলা যে, ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী মানুষজন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণে এবং অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল; বিশেষ করে মূল সড়কগুলোতে রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করায় তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন।

শব্দদূষণ ও খানাখন্দে ভরা সড়ক এবং অপরিচ্ছনতার শহর হিসেবেই দেখছেন সবাইশব্দদূষণ ও খানাখন্দে ভরা সড়ক এবং অপরিচ্ছনতার শহর হিসেবেই দেখছেন সবাই

তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন বলেন, ‘সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে তালাইমারী থেকে ভদ্রা হয়ে শিরোইল বাস টার্মিনাল পর্যন্ত সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজগুলোও দ্রুত শুরু হবে। এ ছাড়া আগামী জুন মাসের মধ্যে তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ সম্পন্ন হবে। অন্য আরেকটি ফ্লাইওভারের কাজও দ্রুত শেষ হবে। তাহলে আর জনভোগান্তি থাকবে না।’

ময়লা-আবর্জনার স্তূপ

শহরজুড়ে আধুনিক চওড়া সড়ক ব্যবস্থা থাকায় ফুটপাতে আরামে হেঁটে চলা যেতো। ফুটপাত ও সড়ক বিভাজকে ঋতুভেদে রোপিত বিভিন্ন জাতের ফুলের সৌন্দর্য নগরবাসীকে মোহিত করতো। একসময় নির্মল বায়ুর শহর হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিল। আলোক বাতির কারণে রাতের শহর মুগ্ধ করতো সবাইকে। শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পদ্মার পাড় থেকে নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখা যেতো। টি-বাঁধ ও আই-বাঁধসহ কয়েকটা স্পট বিনোদনপ্রেমীদের কাছে ছিল অন্যতম। কিন্তু এখন সে অবস্থা আর নেই। সড়ক ও নদীর পাশে রাখা হয় ময়লা-আবর্জনা। প্রধান সড়কগুলো নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া হলেও পদ্মা তীরবর্তী ফুটপাতে আবর্জনা জমে স্তূপ হয়েছে। সেগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। সিটি হাট এলাকায় পরিশোধন ছাড়াই ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। যা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে কৃষিজমি ও নদীতে গিয়ে মিশছে। নগরীর বেশিরভাগ ড্রেন অপরিষ্কার। যেসব ড্রেন পরিষ্কার করা হয়, সেসব ময়লা-আবর্জনা ড্রেন থেকে তোলার পর সড়কের ওপর দীর্ঘদিন রেখে দেওয়া হয়। যা থেকে জীবাণু ছড়ায়। বর্তমানে ফুটপাত অনেকটাই দখলে। আবার অনেক স্থানে ফুটপাতের ঢাকনাও চুরি হয়ে গেছে। যা উন্মুক্ত পথে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারী।

এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, ‘আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন ভ্যানগাড়ি দিয়ে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে। প্রতিদিন রাতে ও দিনে সড়ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। সেসব ময়লা জমা হয় নগরীর ১৭টি পয়েন্টে রাখা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে। সেখান থেকে রাতে ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে সিটি হাট এলাকায় ডাম্পিং করা হয়। বর্তমানে ১ হাজার ২৬৫ পরিচ্ছন্নতাকর্মী এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। প্রতিদিন বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ, রাস্তাঘাট ও ফুটপাত থেকে ৩৫০ থেকে ৪০০ মেট্রিক বর্জ্য উৎপাদন হয়। সেগুলো সিটি হাট এলাকায় ডাম্পিং করা হয়।’

এক লাইসেন্সে চলে একাধিক রিকশা-অটোরিকশা, যানজটে ভোগান্তি

শহরে চলাচলের জন্য সিটি করপোরেশন থেকে ৮ হাজার ৯৭০টি অটোরিকশা ও ৫ হাজার ৮১৯টি রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এখন শহরে চলছে ২৫ হাজারের বেশি। যা তীব্র যানজট তৈরি করছে। এক লাইসেন্সে একাধিক রিকশা ও অটোরিকশা চলছে। এসব বন্ধে সিটি করপোরেশন থেকে কার্যত কোনও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। 

ফ্লাইওভার নির্মাণে ধীরগতিতে যানজট

শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর চারটি পয়েন্টে ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য যানজট বেড়েছে। বিশেষ করে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বহরমপুর-বিলসিমলা, বন্ধ গেট ও রেলগেট এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে এই এলাকায় যানবাহন চলাচল সীমিত করায় নগরীতে যানজট বেড়েছে। আবার শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান শিরোইল থেকে বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে না নেওয়ায় বাসে যাত্রী ওঠানামার কারণেও যানজট তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া ভদ্রা মোড়েও অসস্থায়ীভাবে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল যাত্রী ওঠানামা করার কারণেও যানজট দেখা দিচ্ছে।

ফুটপাত দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানফুটপাত দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

নিয়মিত কর দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত কর দিলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছি না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এমনটি হচ্ছে। শহরের কোথাও শৃঙ্খলা নেই। একটি লাইসেন্সে ১০টি গাড়ি চলে। তৈরি হচ্ছে যানজট। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং যততত্র ময়লা ফেলে অপরিচ্ছন্ন নগরী বানানো হয়েছে। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। ঠিকভাবে শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে না। যানবাহনে শৃঙ্খলা নেই। ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মশার উপদ্রব বেড়েছে। নির্মাণকাজ চলায় যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রাখা হচ্ছে। এজন্য বায়ুদূষণ বাড়ছে। অর্থাৎ রাজশাহীকে যে গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি ও হেলদি সিটি বলা হতো, তার সবই হ্রাস পাচ্ছে। দ্রুত এসব বিষয়ে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।’

নগরীতে বসবাস করেও বস্তিবাসী সেবা থেকে বঞ্চিত

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ-বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী নৃবিজ্ঞানী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘একটি আধুনিক শহর তাকেই বলা যায়, যার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক। রাজশাহী সিটির বর্জ্য ফেলা হয় নদীতে। যা কৃষিজমিতে মিশে কৃষি ব্যবস্থাপনা ধ্বংস করছে। নগরীতে বসবাস করেও বস্তিবাসী সিটি করপোরেশনের সেবা থেকে বঞ্চিত। বেশিরভাগ বস্তিতে নেই বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। আবাসন ব্যবস্থাও নেই তাদের জন্য। এসব বিষয়ে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।’

ট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজনের) রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন, ‘রাজশাহীতে বড় বড় রাস্তা রয়েছে। কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর। যেখানে সেখানে গাড়ি থামায়, ট্রাফিক সিগন্যাল নাই। অটোরিকশার আধিক্যে চলাচল করা মুশকিল। এর মধ্যে আবার সিএনজি স্ট্যান্ড শহরের ভেতরে। নওদাপাড়া এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার পরও শিরোইল ও ভদ্রা এলাকা থেকে বাসস্ট্যান্ড সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে রাস্তাগুলোতে তীব্র যানজট লেগে থাকে। রেলগেট, শিরোইল ও ভদ্রা এলাকার সড়কগুলো ক্রমে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। এজন্য বাসস্ট্যান্ড ও সিএনজি স্ট্যান্ড শহর থেকে সরিয়ে নওদাপাড়ায় নেওয়া উচিত।’

কমাতে হবে শব্দ ও বায়ুদূষণ

রাজশাহীর বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন খান বলেন, ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যানবাহনগুলো বিশেষ করে রিকশা ও অটোরিকশা যাতে টিটি হর্ন ব্যবহার না করে যাতে ভেপু হর্ন ব্যবহার করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ ভেপু হর্নের ফ্রিকোয়েন্সি আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকে। টিটি হর্নের ফ্রিকোয়েন্সি দূরে ছড়িয়ে পড়ে। সাহেব বাজার, লক্ষ্মীপুর ও রেলগেট এলাকায় যাতে পরিবহনে যাত্রী উঠাতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় গাছ লাগানোর পাশাপাশি বায়ুদূষণ নীতিমালায় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের নীতি অনুসরণ করলে অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’

ট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুরট্রাফিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর

গাছ লাগানোর বিকল্প নেই

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্যাহ আল মারুফ বলেন, ‘বড় গাছ যে পরিমাণ ছায়া ও আরাম দিতে পারে তা ছোট গাছ দিতে পারে না। নির্মল বায়ু পেতে অবশ্যই বড় গাছ লাগাতে হবে। আবার বড় গাছের অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। অথচ রাজশাহীতে ১৯৯৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ শতাংশ সবুজায়ন কমেছে। এটা হতাশার কথা। কাজেই গাছ লাগানোর বিকল্প নেই।’

রাজশাহী সচেতন নাগরিক সমাজের তরিকুল কালাম স্বপন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে নাগরিক সেবার অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। জন্ম নিবন্ধন, নাগরিক ও মৃত্যু সনদপত্র পেতে ভোগান্তি বেড়েছে। নতুন হোল্ডিং খোলার জন্য সেবাগ্রহীতা সিটি করপোরেশনে গেলে কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়ছেন। ভবন নির্মাণে এনওসি পেতে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ছাড়পত্র পেতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন করে খুলতে গেলেও ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের অলিগলিতে বৈদ্যুতিক ল্যাম্পপোস্টগুলোতে মাসের পর মাস লাইট না থাকলেও সে বিষয়ে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। বিভিন্ন ধরনের ভাতা পেতেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ভাতাভোগীদের।’

নগরের একাধিক বাসিন্দা জানান, নগরের প্রধান হিসেবে একজন জনপ্রতিনিধি না থাকায় পদে পদে নানা জটিলতার শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। দীর্ঘ ১৯ মাস ধরে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের এই অচল অবস্থা নিরসনের জন্য নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক চান তারা। 

প্রসঙ্গত, ঢাকা উত্তর, দক্ষিণসহ দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে ছয় জন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখনও বাকি রয়েছে আরও ছয়টি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ। এর মধ্যে অন্যতম রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। প্রশাসক নিয়োগকে ঘিরে দলীয় অঙ্গনে শুরু হয়েছে তৎপরতা। অন্তত হাফ ডজন বিএনপি নেতা প্রশাসক হওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন। যারা ইতোমধ্যে দলের হাই কমান্ডে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি তিন জনের নাম শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে দুজন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা।