ঢাকা ০৪:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন: পর্যালোচনায় জাতিসংঘ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেতে অপেক্ষা কয়েক সপ্তাহের

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:১৮:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা শুরু করেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। সরকারের পক্ষ থেকে এই সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে সিডিপির পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠক চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আবেদনটি গ্রহণ করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।

সিডিপির সদস্য এবং এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো চিঠিটি সিডিপি গ্রহণ করেছে এবং এতে উপস্থাপিত যুক্তিগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, আবেদন গ্রহণ করার অর্থই এটি অনুমোদিত হওয়া নয়। সিডিপি তাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন শেষে সুপারিশমালা জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসোক) পাঠাবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসের সুযোগ নেই।

ড. দেবপ্রিয় আরও উল্লেখ করেন, ইএমএম কাঠামোর অধীনে ‘ক্রাইসিস বাটন’ নামে একটি বিশেষ বিধান রয়েছে, যা কোনো দেশের অনাকাঙ্ক্ষিত বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সংকটের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ এই বিশেষ বিধানের আওতায় আবেদন করেছে কি না এবং বর্তমানে দেশে প্রকৃতপক্ষেই কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিরাজ করছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়।

আবেদনপত্রে সরকার উল্লেখ করেছে যে, মাথাপিছু জাতীয় আয় ও মানবসম্পদ সূচকের মতো মানদণ্ডগুলো অর্জিত হলেও বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অভিঘাতে উত্তরণের প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক কড়াকড়িকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিকের আশ্রয়ের চাপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাড়তি শুল্কের ঝুঁকি রয়েছে। এমতাবস্থায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।

সিডিপি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বৈঠকের দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে। সব প্রক্রিয়া শেষে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সাধারণ পরিষদ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশ উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এর আগেও একবার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল ও লাওসের উত্তরণ প্রক্রিয়া সিডিপির পর্যালোচনায় রয়েছে। এখন সবার নজর জাতিসংঘের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে, যা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের পরবর্তী সময়রেখা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের: ‘আগ্রাসীরা অনুতপ্ত হবে’

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন: পর্যালোচনায় জাতিসংঘ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেতে অপেক্ষা কয়েক সপ্তাহের

আপডেট সময় : ০২:১৮:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা শুরু করেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। সরকারের পক্ষ থেকে এই সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে সিডিপির পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠক চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আবেদনটি গ্রহণ করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।

সিডিপির সদস্য এবং এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো চিঠিটি সিডিপি গ্রহণ করেছে এবং এতে উপস্থাপিত যুক্তিগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, আবেদন গ্রহণ করার অর্থই এটি অনুমোদিত হওয়া নয়। সিডিপি তাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন শেষে সুপারিশমালা জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসোক) পাঠাবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসের সুযোগ নেই।

ড. দেবপ্রিয় আরও উল্লেখ করেন, ইএমএম কাঠামোর অধীনে ‘ক্রাইসিস বাটন’ নামে একটি বিশেষ বিধান রয়েছে, যা কোনো দেশের অনাকাঙ্ক্ষিত বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সংকটের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ এই বিশেষ বিধানের আওতায় আবেদন করেছে কি না এবং বর্তমানে দেশে প্রকৃতপক্ষেই কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিরাজ করছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়।

আবেদনপত্রে সরকার উল্লেখ করেছে যে, মাথাপিছু জাতীয় আয় ও মানবসম্পদ সূচকের মতো মানদণ্ডগুলো অর্জিত হলেও বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অভিঘাতে উত্তরণের প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক কড়াকড়িকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিকের আশ্রয়ের চাপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাড়তি শুল্কের ঝুঁকি রয়েছে। এমতাবস্থায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।

সিডিপি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বৈঠকের দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে। সব প্রক্রিয়া শেষে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সাধারণ পরিষদ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশ উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এর আগেও একবার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল ও লাওসের উত্তরণ প্রক্রিয়া সিডিপির পর্যালোচনায় রয়েছে। এখন সবার নজর জাতিসংঘের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে, যা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের পরবর্তী সময়রেখা।