ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের আকস্মিক তৎপরতা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে আসা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হওয়া এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্ধ থাকা দলীয় কার্যালয় পুনরায় খোলার চেষ্টা—সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘মৌন প্রত্যাবর্তনের’ আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী একাধিক নেতার জামিনে মুক্তি এবং কিছু এলাকায় বিএনপির সঙ্গে ‘বোঝাপড়ার’ গুঞ্জন এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। গণবিক্ষোভের মুখে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই কঠোর অবস্থানে কিছুটা শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরদিন থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোর তালা খুলতে শুরু করে। পঞ্চগড়, ধানমন্ডি ও গুলিস্তানসহ দেশের অর্ধশতাধিক এলাকায় দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং স্লোগান দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এমনকি ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনাও জনমনে বিস্ময় তৈরি করেছে।
আওয়ামী লীগের এই তৎপরতার সমান্তরালে আইনি অঙ্গনেও বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান। গত এক সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আইভী রহমান, আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বডিসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। বরিশাল, ঠাকুরগাঁও ও কুমিল্লার মতো জেলাগুলোতেও আওয়ামী লীগ নেতাদের কারামুক্তি এবং স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তাদের সৌজন্য বিনিময়ের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে আওয়ামী ঘরানার ভোট টানতে স্থানীয় পর্যায়ে যে অলিখিত সমঝোতা হয়েছিল, এসব ঘটনা তারই প্রতিফলন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তীকালীন আন্দোলনের সহযোগী শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, একটি নিষিদ্ধপ্রায় দলের এভাবে প্রকাশ্যে আসা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপ। দলটির অভিযোগ, বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ‘ছাড় দেওয়ার মানসিকতা’ এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিই আওয়ামী লীগকে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সাহস দিচ্ছে। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা ছাত্র-জনতা কঠোরভাবে প্রতিহত করবে। তারা এই পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনের জবাবদিহিও দাবি করেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা করতে চান। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করেছেন যে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম যেহেতু আইনত নিষিদ্ধ, তাই তাদের বিষয়ে আইনি পথেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের অন্য নেতারা একে ‘উদারনৈতিক রাজনীতির’ অংশ হিসেবে দাবি করলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক তারেক ফজল মনে করেন, এটি মূলত এলাকাভিত্তিক কৌশলগত সমঝোতা। তার মতে, আইনি প্রক্রিয়ায় সরকারি কৌঁসুলিদের ভূমিকা এখানে প্রশ্নাতীত নয়।
এদিকে, বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলের জয়লাভ দলটির সাংগঠনিক ভিত্তির টিকে থাকার প্রমাণ দিচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ বড় ধরনের শো-ডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারতের অবস্থানরত শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক অডিও বার্তা নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে, জুলাই বিপ্লবের চেতনা বনাম আওয়ামী লীগের এই প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা দেশের রাজনীতিকে আবারও এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।
রিপোর্টারের নাম 

























