ঢাকা ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

উপসাগরীয় যুদ্ধ ও সার সংকট: বিপাকে দক্ষিণ এশিয়ার ২ বিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি খাতে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংকটের ফলে সার ও জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের কোটি কোটি কৃষকের জীবনযাত্রা ও খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে। ইউরিয়া সার তৈরির প্রধান উপাদান প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সরাসরি আমদানিকৃত সারের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলটি থেকে আসে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ করা হয়, যা বন্ধ থাকায় পরিবহন ও বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে হাজার মাইল দূরের দক্ষিণ এশিয়ার ফসলি মাঠে সারের দাম বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সংকটের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে।

ভারতের পাঞ্জাব থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রংপুর এবং নেপালের গুলমি জেলা পর্যন্ত কৃষকদের মধ্যে একই হাহাকার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের ৪২ বছর বয়সী কৃষক রমেশ কুমার বা কাশ্মীরের সরিষা চাষী গোলাম রসুলের মতো লাখ লাখ মানুষের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ; কারণ সারের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের সন্তানদের পড়ালেখা বা বিয়ের মতো পারিবারিক পরিকল্পনাগুলো স্থগিত করতে হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ভারতের সারের চাহিদার প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ২৫-৩০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি হয়ে সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ ব্যবস্থা সামান্য বিঘ্নিত হলেও তা সরাসরি ফসল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার মতো সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি তৈরি করছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলো কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তান সরকার অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললেও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি সচিব রফিকুল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্বল্পমেয়াদে ৫ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন ও মরক্কোর মতো বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ ও নেপাল। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম টনপ্রতি ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য কঠিনতম পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অধ্যাদেশ ও সংস্কার ইস্যুতে সরকারের ইউ-টার্ন

উপসাগরীয় যুদ্ধ ও সার সংকট: বিপাকে দক্ষিণ এশিয়ার ২ বিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা

আপডেট সময় : ১২:১০:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি খাতে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংকটের ফলে সার ও জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের কোটি কোটি কৃষকের জীবনযাত্রা ও খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে। ইউরিয়া সার তৈরির প্রধান উপাদান প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সরাসরি আমদানিকৃত সারের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলটি থেকে আসে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ করা হয়, যা বন্ধ থাকায় পরিবহন ও বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে হাজার মাইল দূরের দক্ষিণ এশিয়ার ফসলি মাঠে সারের দাম বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সংকটের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে।

ভারতের পাঞ্জাব থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রংপুর এবং নেপালের গুলমি জেলা পর্যন্ত কৃষকদের মধ্যে একই হাহাকার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের ৪২ বছর বয়সী কৃষক রমেশ কুমার বা কাশ্মীরের সরিষা চাষী গোলাম রসুলের মতো লাখ লাখ মানুষের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ; কারণ সারের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের সন্তানদের পড়ালেখা বা বিয়ের মতো পারিবারিক পরিকল্পনাগুলো স্থগিত করতে হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ভারতের সারের চাহিদার প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ২৫-৩০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি হয়ে সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ ব্যবস্থা সামান্য বিঘ্নিত হলেও তা সরাসরি ফসল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার মতো সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি তৈরি করছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলো কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তান সরকার অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললেও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি সচিব রফিকুল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্বল্পমেয়াদে ৫ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন ও মরক্কোর মতো বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ ও নেপাল। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম টনপ্রতি ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য কঠিনতম পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।