ঢাকা ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

অনলাইন ক্লাসের পথে সরকার: জ্বালানি সাশ্রয়ের সমীকরণ নাকি শিক্ষা বৈষম্যের নতুন শঙ্কা?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৩:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • ৪২ বার পড়া হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের মহানগরী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে (অফলাইন) ক্লাস নেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই পরিকল্পনার কথা জানান। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে মত দিলেও শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণের কথা ভেবে পুরোপুরি অনলাইনে না গিয়ে মিশ্র পদ্ধতি বা ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের কথা ভাবা হচ্ছে।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে স্কুল চলাকালীন কর্মদিবস সপ্তাহে পাঁচ দিন থেকে বাড়িয়ে ছয় দিন করা হবে। তবে কোভিডের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এই উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা কতটা লাভবান হবে এবং প্রকৃত অর্থে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও খোদ শিক্ষকদের মধ্যেই চরম মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ সভায় এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার কথা রয়েছে।

অনলাইন পাঠদানের খবর আসার পরপরই সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে চরম দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর ভাটারা এলাকার শাহদাৎ হোসেন ফাহাদের মতো অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস বা স্মার্টফোন নেই, যা অনলাইন ক্লাসের প্রধান অন্তরায়। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন স্মার্টফোন কেনা তাদের পক্ষে অসম্ভব। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থী বাসায় একা অনলাইন ক্লাস বুঝতে অক্ষম এবং প্রত্যেকের ঘরে আলাদাভাবে ফ্যান ও ডিভাইস চললে বিদ্যুতের ওপর উল্টো চাপ বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

তবে কিছু স্বচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইন ক্লাস সহজসাধ্য হলেও সামগ্রিকভাবে এটি একটি বড় ধরনের ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরাও এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, কোভিডের সময় অনলাইন ক্লাসে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি এবং অনেক শিক্ষকের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব ও শিক্ষার্থীদের ডিভাইসের অপব্যবহারের ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী মনে করেন, তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন অফলাইন ক্লাসে কেবল বিশ্রামই বাড়বে, শিক্ষার গুণগত কোনো লাভ হবে না।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে মহানগর এলাকায় কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে নেই। কর্মকর্তারা কেবল যানজট কমার সম্ভাবনার কথা বললেও এর আর্থিক বা জ্বালানি সাশ্রয়ের কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেননি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, অনলাইন ক্লাস কোনো আদর্শ সমাধান নয় এবং এটি উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যে শিক্ষার ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেবে।

অন্যদিকে, সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর এই চাপ প্রয়োগ না করে ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বা গণপরিবহন ব্যবহারের মতো বিকল্প ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। তিনি মনে করেন, প্রকৃত সাশ্রয়ের তথ্য জনসমক্ষে না এনে শিক্ষার্থীদের ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা তাদের দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানের সুযোগ নেওয়ার মতো মনে হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শর্ত না মানলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বাতিলের হুঁশিয়ারি ইরানের

অনলাইন ক্লাসের পথে সরকার: জ্বালানি সাশ্রয়ের সমীকরণ নাকি শিক্ষা বৈষম্যের নতুন শঙ্কা?

আপডেট সময় : ১২:০৩:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের মহানগরী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে (অফলাইন) ক্লাস নেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই পরিকল্পনার কথা জানান। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে মত দিলেও শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণের কথা ভেবে পুরোপুরি অনলাইনে না গিয়ে মিশ্র পদ্ধতি বা ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের কথা ভাবা হচ্ছে।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে স্কুল চলাকালীন কর্মদিবস সপ্তাহে পাঁচ দিন থেকে বাড়িয়ে ছয় দিন করা হবে। তবে কোভিডের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এই উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা কতটা লাভবান হবে এবং প্রকৃত অর্থে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও খোদ শিক্ষকদের মধ্যেই চরম মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ সভায় এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার কথা রয়েছে।

অনলাইন পাঠদানের খবর আসার পরপরই সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে চরম দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর ভাটারা এলাকার শাহদাৎ হোসেন ফাহাদের মতো অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস বা স্মার্টফোন নেই, যা অনলাইন ক্লাসের প্রধান অন্তরায়। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন স্মার্টফোন কেনা তাদের পক্ষে অসম্ভব। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থী বাসায় একা অনলাইন ক্লাস বুঝতে অক্ষম এবং প্রত্যেকের ঘরে আলাদাভাবে ফ্যান ও ডিভাইস চললে বিদ্যুতের ওপর উল্টো চাপ বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

তবে কিছু স্বচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইন ক্লাস সহজসাধ্য হলেও সামগ্রিকভাবে এটি একটি বড় ধরনের ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরাও এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, কোভিডের সময় অনলাইন ক্লাসে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি এবং অনেক শিক্ষকের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব ও শিক্ষার্থীদের ডিভাইসের অপব্যবহারের ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী মনে করেন, তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন অফলাইন ক্লাসে কেবল বিশ্রামই বাড়বে, শিক্ষার গুণগত কোনো লাভ হবে না।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে মহানগর এলাকায় কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে নেই। কর্মকর্তারা কেবল যানজট কমার সম্ভাবনার কথা বললেও এর আর্থিক বা জ্বালানি সাশ্রয়ের কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেননি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, অনলাইন ক্লাস কোনো আদর্শ সমাধান নয় এবং এটি উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যে শিক্ষার ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেবে।

অন্যদিকে, সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর এই চাপ প্রয়োগ না করে ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বা গণপরিবহন ব্যবহারের মতো বিকল্প ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। তিনি মনে করেন, প্রকৃত সাশ্রয়ের তথ্য জনসমক্ষে না এনে শিক্ষার্থীদের ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা তাদের দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানের সুযোগ নেওয়ার মতো মনে হতে পারে।